পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৬-এ ট্রান্স-ক্যুইয়ার মানুষদের স্পষ্ট বিজেপি বিরোধিতা


  • April 30, 2026
  • (0 Comments)
  • 51 Views

কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের রূপান্তরকামী মানুষদের (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী আইন, ২০২৬ নিয়ে আসা এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটের মুখে এসআইআর, যাতে যে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে, সেখানে আপাতত কোনোও পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও এক বড় সংখ্যক মানুষ আছেন ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের – এই দু’টি বিষয় স্পষ্টতই পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের ভোটের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে। রাজ্যের ক্ষমতাসীন শাসক দল, অবিজেপি-বিরোধী দল নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন বক্তব্য থাকলেও, এক জায়গায় এই সম্প্রদায় মুখ্যত একজোট হয়েছে – বিজেপিকে একটিও ভোট নয়। দেশের নাগরিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসাবেই এই রাজনৈতিক দলের বিরূদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন তাঁরা।

 

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন।

 

শুরুর মিছিল, ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া রূপান্তরকামী মানুষ

 

মাঝ এপ্রিলে কলকাতায় এসআইআর বিরোধী এক দীর্ঘ মিছিলে পথ হাঁটার সময় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয় রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের মানুষ, ট্রান্স উওম্যান অনিন্দ্য হাজরার। তাঁর নাম বাদ পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে। তিনি কি মনে করেন ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন বৈধ? “না, একেবারেই বৈধ নয়। ভোটাধিকার, যা আমাদের ফান্ডামেন্টাল রাইটস, তাকে এভাবে খর্ব করা হচ্ছে, একেবারে চক্রান্ত করে। যে এক্সারসাইজ এখানে করা হচ্ছে, যাতে বাদ পড়লেন প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষ, ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটাকে আমরা কীভাবে সমর্থন করতে পারি? এটার ন্যায্যতা কী করে আসতে পারে? প্রত্যেক নাগরিকের যে ভোটের অধিকার সেটাকে এভাবে ছিনিয়ে নেওয়া যায় না,” স্পষ্ট জানিয়েছিলেন তিনি।

 

আসলে সমস্ত নাগরিক বিরোধী আইনই রাষ্ট্রের দমন-পীড়ন নীতির মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তা দেখানোর জন্যই সেই মিছিলে ট্রান্স অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বিরোধী পোস্টার হাতে ও এসআইআর বিরোধী পোস্টার পিঠে ঝুলিয়ে পথ হাঁটা অনিন্দ্য বলছিলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি সম্প্রতি বিভিন্ন আইন, এই যে ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ২০২৬, সেখানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, “নীর-ক্ষীর” করবেন। এই “নীর-ক্ষীর” করার রাজনীতিই তো এসআইআর-এর রাজনীতি। এই এসআইআর-এর রাজনীতির পেছনে এই ট্রান্স অ্যাক্ট ইত্যাদি সব কিছুই রয়েছে। আমি একজন রূপান্তরকামী মানুষ, আমি তাই মনে করি এই সবগুলি পরস্পর জড়িত। সেইজন্যই এই মিছিলে শামিল হয়েছি। কারণ আমার মতো অনেক মানুষ এই এক্সারসাইজে বাতিল হয়ে গেছেন।” তাঁর হাতের পোস্টারে লেখা ছিল “#রেজিস্ট ট্রান্স অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ইজ এস আই আর”।

 

সচেতনতা শিবির, জোর গলায় বিজেপি-মোদী বিরোধীতা, দাবি মৌলিক অধিকারের

 

পৌঁছেছিলাম হুগলির শেওড়াফুলিতে। কলকাতা আনন্দম সংস্থার উদ্যোগে এপ্রিলের এক দুপুরে সেখানে ছিল রূপান্তরকামী মানুষদের (মূলত ট্রান্স উওম্যান) নিয়ে সদ্য পাশ হওয়া ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট নিয়ে একটি আইনি সচেতনতা শিবির। তার মাঝেই নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর দিলেন উপস্থিত মানুষেরা। আলোচনার শেষে সমবেতভাবে উঠে এসেছিল বিজেপি তথা মোদি-বিরোধিতা। রূপান্তরকামী নারী সিন্টু বাগুইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সঠিক নির্বাচন বলে মনে করছেন কি না। উত্তরে বললেন, “দেখুন সংবিধান অনুযায়ী, আইনের নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন হতেই হবে পাঁচ বছর পর। তা তো হচ্ছে। সঠিক কি না, তা বলার এক্তিয়ার হয়তো আমার নেই। কিন্তু যা চলছে আমাদের সাথে, এসআইআর, ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টের নামে ট্রান্স-ক্যুইয়ার মানুষদের ক্যান্সেল করে দেওয়া হচ্ছে, সেটার জন্য এটা মোটেই সঠিক সময় নয়। আমার খুবই হতাশ লাগছে। এখনোও জানি না, ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়া মানুষের মধ্যে কতজন ট্রান্স-ক্যুইয়ার মানুষ আছেন। সেই হদিশ এখনোও পাইনি। এস আই আর পদ্ধতিটা খুব তাড়াহুড়োয় হল। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, অন্য রাজ্যেও হয়েছে। আমার মনে হয়, এ রাজ্যে খেটে খাওয়া, মেহনতী, শ্রমজীবী মানুষজন অনেকটা বেশি, অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করে, ঠিক সময়ে ভোট দিতে আসতে পারে না। তাঁদের অনেকের নাম বাদ গেছে। এই পদ্ধতিটা আরোও বিবেচনা করা উচিৎ ছিল।”

 

বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে প্রান্তিক লিঙ্গ, যৌন পরিচিতির মানুষদের কথা কতটা আসে? “কোনোও ম্যানিফেস্টোতে আসে না। আগের বার সব দল একটু করে লিখেছিল। সিপিএম একটু লিখেছে। প্রতি বছর আমরা একটা ট্রান্স-ক্যুইয়ার মানুষদের ম্যানিফেস্টো বানিয়ে সব রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠাই। এসআইআর নিয়ে এ রাজ্যের সব রাজনৈতিক দলের মতামত, বক্তব্য রয়েছে, যখন পাহাড় বেচা হচ্ছিল তখন আদানি, আম্বানির বিরূদ্ধে সবার বক্তব্য ছিল, অবশ্যই এই সব কিছুর বিরূদ্ধেই বক্তব্য থাকতে হবে। কিন্তু যখন এই অ্যাক্ট দিয়ে একটা গোটা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে তখন কারোর কোনোও বক্তব্য নেই! পার্লামেন্ট-এ হয়তো রিপ্রেজেন্টেটিভরা একবার বলেছেন। কিন্তু এই ভোটের আগে কেউ এসে বলেনি যে আমরা তোমাদের পাশে আছি, তোমাদের সঙ্গে আছি,” বক্তব্য সিন্টুর।

 

এই বছরেও কোনোও দলের কোনোও ট্রান্সজেন্ডার প্রার্থী নেই। এ বিষয়ে তিনি বললেন, “প্রার্থী তো কোনোবারেই নিয়ে আসা হয় না। হয়তো এখনো আমরা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হুল ফোটাতে পারিনি। আমাদের শাসক দল স্বঘোষিত সমকামী একজন মানুষকে রাজ্যসভায় মনোনীত করল। কোনোও দল যারা বলে রামধনুর সঙ্গে কথা বলি, ক্যুইয়ার-ট্রান্স মানুষদের সঙ্গে থাকি তারা তো কেউ একটা প্রার্থী ঘোষণা করেনি। জেতা-হারা পরের কথা। অন্যান্য রাজ্যে কিন্তু অনেক সময়েই প্রার্থী দাঁড়ায়। নেপালে তো একজন এমপি হলেন, তাঁকে মন্ত্রীত্বও দেওয়া হল।” সিন্টু মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে সাংগঠনিক মুখপাত্র হিসাবে কোনোও কোনোও দল ট্রান্স-ক্যুইয়ার গোষ্ঠী থেকে কাওকে কাওকে নির্বাচিত করলেও, নির্বাচনী রাজনীতিতে কোনোও দলই তাঁদের মুখ করছে না।

 

সিন্টু নির্বাচনের আগে যে দাবি রাখলেন তা হল – (১) রাজনৈতিকভাবে রূপান্তরকামী মানুষদের রিসার্ভেশন দেওয়া হোক শুধু এমপি, এমএলএ নয়, পঞ্চায়েত, পৌর কাউন্সি্ল সর্বত্র। সব রাজনৈতিক দলের একটা নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ থাকা দরকার, যাতে এই গোষ্ঠী থেকে রিপ্রেজেন্টেশন থাকে। (২) এসআইআর-এর পাশাপাশি ট্রান্স অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-এর বিরূদ্ধে যে লড়াই তাতে সব রাজনৈতিক দল পাশে থাকুক। (৩) সব জায়গায় এই গোষ্ঠীর সমানাধিকার থাকুক।

 

“এস আই আর একটা লং টার্ম প্রসেস। এটা এক মাসের মধ্যে কী করে করা হল। এটা একটা পলিটিক্যাল ইস্যুর জন্যই করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়। মহিলাদের ভোট, মুসলিমদের ভোট বেশি কাটা গেছে – সবার কাছে জলের মতো পরিষ্কার বিষয়টা কী। যদি নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা থাকত তাহলে নির্বাচনের অনেক আগে বা নির্বাচনের পরে করতে পারত। আমার ৭৫ বছরের বাবাকে নিয়ে যেতে হয়েছে। আমার মা স্ট্রোক পেশেন্ট, ভাগ্যিস তার নামটা আসেনি, আসলে তাকেও নিয়ে যেতে হত। এই হ্যারাসমেন্ট-এর মানে কী?” রাগত স্বরে জানালেন উত্তর ২৪ পরগণার বিকাশ মজুমদার, একজন ট্রান্স নারী। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন, তাঁর ভোটার পরিচিতি প্ত্রের সঙ্গে তাঁর বর্তমান লম্বা চুল ও নারীসুল্ভ পরিচিতির অসাদৃশ্য থাকায় প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছে।

 

সমবেতভাবে সকলেই জানালেন কোনোও রাজনৈতিক দলই ভোটের সময় তাঁদের সঙ্গে দেখা করে না, বা তাঁদের দাবি-দাওয়া শোনার চেষ্টা করেন না। কেন? সোজাসুজি উত্তর এল, “আমরা সংখ্যালঘু বলে।” প্রত্যেকেই জানালেন বিজেপিকে কোনোও দিনই তাঁরা তাঁদের খোঁজখবর নিতে দেখেননি। অন্য রাজনৈতিক দলেরও প্রায় একুই অবস্থান। কম হলেও কোন কোন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা যোগাযোগ রাখেন।

 

ভোটের পরের যে উন্নয়নের ঘোষণা সেখানে কোথায় দেখতে পান তাঁরা নিজেদের? আদৌ পান কি? “না, কোথাও দেখতে পাই না নিজেদের। শুধু খাতায়-কলমেই আমরা আছি। কিন্তু জমিনি তরফে কিছু হয় না। শুধু ভোটের টাইমে আমাদের খোঁজা হয়। কিন্তু ভোট নেওয়া হয়ে গেলে না আমাদের জিজ্ঞেস করে আমরা কী পরিস্থিতিতে আছি, কী পরছি, খাচ্ছি, কোনোও কাজ আছে কি না আমাদের,” হুগলির ট্রান্স নারী স্বপ্না রঘুবংশীর কন্ঠে এক রাশ ক্ষোভ। স্বপ্না আরোও জানান তাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পান না, সদ্য চালু হওয়া যুবসাথী পেতেও সমস্যা হচ্ছে পড়াশোনা চলাকালীন পুরুষ পরিচিতি পত্র ও বর্তমানের ট্রান্সজেন্ডার পরিচিতির জন্য, আবাস যোজনাতে ঘর পেতেও সমস্যায় পড়েছেন, ভোট পরবর্তী সময়ে নেতারা আর তাঁদের কথা শোনেন না বলেই ক্ষোভ উগরে দিলেন, সঙ্গে জানালেন চাকরির ব্যবস্থা না থাকাও অত্যন্ত সমস্যাজনক।

 

এর মাঝেই একজন ডাকলেন, “দিদি আমি বলব।“যে ভাষ্যগুলি উঠে আসে – পূজা বলেন, “ইয়ে যো মোদি কর রহা হ্যায় ইয়ে আচ্ছা নেহি কর রহা হ্যায়। মোদি নে কেয়া কিয়া হ্যায় হামারে লিয়ে? কুছ নেহি। উও হিন্দু-মুসলিম সব মে লড়াই কিয়া হ্যায়।” গুড্ডুর কথায়, “আমরা কিছু পাই না। না মোদী সরকার দেয়, না মমতা সরকার দেয়। যা রোজগার করতে পারি, তাই খাই।” আরেক ট্রান্স নারী স্পষ্ট বলেন, “মোদীকে দেখাতে হয় ও ছেলে না মেয়ে? তাহলে আমরা কেন চেক-আপ করাব? দেখে নিয়েছি নোটবন্দী, গ্যাসের দাম বাড়ানো, কিসানদের সঙ্গে কী করতে গেছিলেন। এখন আমাদের ট্রান্সদের পেছনে পড়েছেন। কেন?” রাগ, হতাশা মিশে যায় কন্ঠে।

 

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলির কাছে কী দাবি জানাবেন তাঁরা? উঠে এল যেসব দাবি 

 

  • আমাদের চাকরি দাও। আমরা সবার মতো চাকরি করব।

 

  • চাকরিটা এমন হতে হবে, সব সরকারি জায়গায় একজন করে ট্রান্সজেন্ডার থাকতে হবে। তাহলে সমাজে আমাদের প্রতি যে ভেদ-ভাঁও আছে, সেটাও কমবে। আমাদের দেখলে সবাই এখনো মুখ বাঁকিয়ে হিজড়া বলে। পৌরসভায় চাকরি করলে বলবে – ওই দেখো মাসি, সম্মানটা বাড়বে।

 

  • ট্রান্সজেন্ডারদের যে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তা ফেরত দিতে হবে।

 

  • কোনোও সরকারি হসপিটালে যখন ভর্তি হতে যাই, তখন প্রচণ্ড অসুবিধা হয়। আমাদের নাক ফুটো, চুল আছে বড় – আমরা ছেলে না মেয়ে বুঝতেই পারে না ওনারা। আমাদের নিয়ে ডাক্তার-আয়া-সিস্টাররা হাসাহাসি, রহস্য করে। মেল ওয়ার্ড না ফিমেল ওয়ার্ড বুঝতে পারে না। এটার যেন একটা সুরাহা হয়।

 

ট্রান্সজেন্ডার সংশোধনী আইন, ২০২৬, এসআইআর – বিধানসভা নির্বাচনের নির্ণায়ক

 

ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ২০২৬ এই বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কেমন প্রভাব ফেলতে চলেছে এই প্রশ্নের উত্তরে দীপন, একজন ট্রান্সম্যান ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জানালেন, “এই বছরের বিধানসভা নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিজেপির বিরূদ্ধে আওয়াজ তুলছি আর ভোটিংও সেরকমই হবে। ভারতবর্ষ একটা ডেমোক্র্যাটিক কান্ট্রি, সেখানে দাঁড়িয়ে ভোট আমার একটা ডেমোক্র্যাটিক রাইট, কন্সটিটিউশনাল রাইট। আমরা সেদিক থেকে বলতে পারি বরাবর, প্রথম থেকে গৈরিকীকরণের বিরূদ্ধে ছিলাম, আজও আছি। যে বিলটি এসেছে, তা পুরোপুরি আমাদের কমিউনিটিকে নস্যাত করে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বরাবর গৈরিকীকরণ, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, জাতিভেদ এই সব কিছুর বিরূদ্ধে। আমাদের আন্দোলনও, কখনো এগুলো মেনে নেয়নি। কারণ আমাদের ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি, এলজিবিটিকিউআইএ+ কমিউনিটির মধ্যে কখনোও ধর্ম আসেনি, জাতি আসেনি। সম্প্রতি এই বিজেপি সরকার এই জিনিসটা ঢোকানোর চেষ্টা করেছে, এক দিকে হিন্দুত্ব নিয়ে গ্রুপ ওরা তৈরি করেছে। আমাদের কমিউনিটির সংখ্যাগরিষ্ঠই বিজেপির রাজনীতির বিরূদ্ধেই রয়েছে, অল্প সংখ্যক হিন্দুত্বের সঙ্গে রয়েছে, তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম।”

 

উত্তরবঙ্গের কোচবিহার থেকে ট্রান্স উওম্যান অরিন্দম (সুমি) দাস এই প্রতিবেদককে বললেন, “এই নির্বাচনের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। কারণ অতি সম্প্রতি কেন্দ্রের যে ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, তা এতদিন ধরে আমরা যে বলে এসেছি ট্রান্সজেন্ডার একটা আম্ব্রেলা টার্ম যেখানে নন-বাইনারি, ক্যুইয়ার, কোতি, ধুরানি, (বাংলার যে বিভিন্ন ভাষা আছে কমিউনিটির), আমরা যে সবাই মিলেমিশে থাকি, সেই অস্তিত্বটাই মুছে দেওয়া হয়েছে। এই বিল যখন সংসদের দুই ক্ক্ষে পাশ করিয়ে নেওয়া হয়, তখন বিরোধী দলের মাননীয় সাংসদেরা প্রশ্ন তুলেছিলেন। যেমন, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু দল। সুতরাং বলা যায় বিরোধিতা ছিল।

 

ভোট তো অবশ্যই দেব, ভোট আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। যতই সরকার বা রাষ্ট্র আমাদের অদৃশ্য করে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, ভোট আমরা দেব। রাজ্যে যে সরকার আসবে, যারা এই বিলের বিরূদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের মে মাসের পরে দেখা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এই বিল এ রাজ্যে কতটা কার্যকরী হবে তা বিধানসভায় যারা যাবেন, তাঁদের মাধ্যমে আলোচনার পরিসরও তৈরি হচ্ছে। আমরা আশাবাদী যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাঁদের ইস্তেহারে ট্রান্সজেন্ডার, ক্যুইয়ার শব্দগুলো লিখেছেন। প্রাক্তন শাসক দল শিক্ষা, কর্ম সংস্থান ইত্যাদি বিষয়গুলির উল্লেখ করেছেন। আসলে কোনো রাজনৈতিক দল ইচ্ছে করল আর একটা সম্প্রদায়কে মুছে ফেলল, তা তো হয় না, এটা কোনোও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয় না। আমরা এই অ্যাক্টের বিরূদ্ধে রাজ্য জুড়ে ডোর-টু-ডোর সই সংগ্রহ করছি এবং পরবর্তীতে রাজ্যে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তার কাছেও যাব।”

 

নদীয়া জেলা থেকে ট্রান্স উওম্যান অ্যানি রায়চৌধুরি (সিল্ক) যেমন জানালেন, “এখনকার যে সরকার রয়েছে তার গাফিলতিতে বিজেপির যে দাদাগিরি বা স্বৈরতন্ত্র তা লাই পেয়েছে। সত্যি কথা বলতে যে পার্টি আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে বিল পাশ করে দিতে পারে, তারা ভোট পেয়ে যদি আমাদের রাজ্যে আসে তাহলে আমাদের কতটা ভালো করবে আমার বোঝা হয়ে গেছে। আর মানুষের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান বিষয়টা এত বেশি ঢুকে গেছে যে ভবিষ্যতে ভোট কাটাকাটির ফলে তাদের সুবিধা হতে পারে। আমি যেহেতু মতুয়া-অধ্যুষিত এলাকায় থাকি, মতুয়া পুরো ভোটটাই বিজেপি পায়। ফলে এবারে কী হতে চলেছে তা নিয়ে চিন্তা আছেই।”

 

এসআইআর-এ নাম বাদ গেছে অসংখ্য রূপান্তরিত মানুষের, অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই নির্বাচন।

 

বাস্তব চিত্রটা ঠিক কেমন বোঝা যায় অরিন্দম (সুমি)-র বক্তব্যে, “আমার যে জেলা কোচবিহার এবং এর পার্শ্ববর্তী বেশ কিছু সীমান্ত এলাকা আছে, পুরো এলাকাটায় খুব স্পর্শকাতর অঞ্চল। দেখুন, কাগজ তো নেই। তার অনেকগুলো কারণ আছে। যে মানুষগুলোকে ছোটবেলায় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়, যারা এক কাপড়ে বের হয়ে আসতে বাধ্য হয়, জন্মের পরে অন্য জায়গায় দিয়ে দেওয়া হয় – ফলে সম্প্রদায়ের অনেকের কাগজ নেই। তার মানে তো এটা নয় যে আমরা নাগরিক নই। এই যে দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছি, গণতন্ত্রে যে নির্বাচিত হবে সেই কাজে অংশগ্রহণ করছি, এটা মিথ্যে হয়ে যাবে তা তো হতে পারে না। প্রচুর মানুষকে ইচ্ছে করে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই খুব সাদা চোখে দেখলে বলতে হয়, এই ভোট গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হল না।

 

আমাদের বর্ডার এলাকায় প্রচুর মুসলমান সম্প্রদায়ের রূপান্তরকামী মানুষ রয়েছেন। তাঁরা বেশিরভাগ ডিলিট হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা তারা যে ডি এম-এর কাছে যাবেন, আমরা সঙ্গে গেলে একটু গুরুত্ব পাচ্ছেন, কিন্তু নিজেরা একা গেলে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের কথা শোনা হচ্ছে না। এর কারণে অনেকের অ্যাডজুডিকেশন এসেছে, নাম বাদ গেছে। খুবই সংকটজনক সময়। এতগুলো মানুষকে বাদ দিয়ে গণতন্ত্রের উৎসব হচ্ছে, এটা বলতে পারি না যে, সকলের সম্মতিতে হচ্ছে।

 

আমাদের পাশের রাজ্য আসামে ২০০০-এর বেশি রূপান্তরকামী মানুষের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের পুরো ডেটা এখনোও পাইনি। আমাদের কাজ তো জাতধর্ম বাদ দিয়ে হয়। আর জাত-বর্ণ-ধর্ম নিয়ে তো একটা গভীর খেলা শুরু হয়েছে। আমাদের কাজ এর উর্ধে।”

 

“কোন দল আছে, যারা আমাদের মতো মাইনরিটির জন্য চিন্তা করেছে? আওয়াজ আমাদের তুলতেই হবে। এই এসআইআর এমন একটা পদ্ধতি যাতে আমাদের মতো ট্রান্সজেন্ডার মানুষ বা কুইয়ার বহু মানুষ ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারেননি, কারণ আমাদের বেশির ভাগ মানুষকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হয়, আমরা বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি। তাই এসআইআর বিরোধী যে আন্দোলন তার সঙ্গে জুড়েই আমাদের আগামী দিনের আন্দোলন চলবে। সিএএ, এনআরসি-র বিরূদ্ধেও আমরা ছিলাম। এটা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।এটা আসলে বিজেপি-র ক্ষমতা দখলের একটা টুল। আসামেও দেখেছি। ওদের ক্ষমতা কতটুকু আমরা জানি। মানুষের মধ্যে শুধু দলাদলি করতে চায়,” বক্তব্য দীপনের।

 

অ্যানি (সিল্ক) জানাচ্ছেন, “উত্তরবঙ্গে অনেকের নাম বাদ গেছে, মুর্শিদাবাদ, নদীয়ারও কিছু কিছু গেছে। কিন্তু ভয়ে অনেকে ব্লতে চাইছে না। ভয় যে, নাম তো বাদ এমনিই গেছে, এবার যদি ডিটেনশন ক্যাম্প-এ পাঠিয়ে দেয় আমাদের ধরে!”

 

ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ, প্রার্থী না করা – বছরের পর বছে নির্বাচনের আগে সব দলেরই চেনা চিত্র। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ বছর অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলির কাছে কী বক্তব্য তাঁদের?

 

দীপন বললেন, “গত নির্বাচনেও সিপি এম-এর ম্যানিফেস্টোতে একটা লাইন ছিল ট্রান্সজেন্ডার আর এলজিবিটিকিউআইএ+ নিয়ে, এ বছরও একটা লাইন আছে। দেখুন, ম্যানিফেস্টোতে থাকা আর বাস্তবায়িত হওয়ার মধ্যে অনেকটা গ্যাপ থেকে গেছে। আমাদের লড়াই গত কয়েক দশকের। কখনোই কোনোও রাজনৈতিক দলের সহায়তা কখনোই পাইনি। ম্যানিফেস্টোতে যখন এসেছে, তা আশার কথা। আমরা সব সময় চাই, কিছুটা আলো যাতে পেতে পারি। আমরা সব সময় চাইব, সিপিএম বা লেফট ফ্রন্ট যারা, যদি জিতে আসেন, আমাদের দাবি থাকবে ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টের বিরূদ্ধে যেন তারা দাঁড়ান আমাদের সাথে। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের ভারতের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার যে রয়েছে, যা আমাদের কাছে দূরবীন দিয়ে দেখার মতো, সেগুলো নিয়ে যেন আমাদের পাশে থাকে। প্রার্থী করতে হবে না, কিন্তু ম্যানিফেস্টোতে রেখেছেন যখন আমাদের আন্দোলনের সাথে থাকুন। দীপ্সিতা ধর, আমাদের কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে মিটিং করেছেন নিজের কেন্দ্রে, তাই আমরা পজিটিভ থাকব। আমাদের আন্দোলন তো দক্ষিণপন্থী নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বামপন্থাতেই আন্দোলনের মুখ দেখি।

 

আশা রাখব, সব বামপন্থী দল, ইন্ডিয়া জোট যেন আন্দোলনের পাশে থাকে। সংসদে অনেকেই আওয়াজ তুলেছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না বলে বিলটি পাশ হয়েছে। আশা রাখছি কিছুটা হলেও পরিবর্তন হবে। এই অ্যাক্টটা যেন উইথড্র করে নেওয়া হয় বা যদি অ্যামেন্ডমেন্ট হয়, তাহলে যেন নালসা জাজমেন্ট মেনে হয়।”

 

“দেখুন এবার কিন্তু জাতীয় স্তরেও এই আলোচনা শুরু হয়েছে যে আমরা কোনোও রাজনৈতিক দল গঠন করব কি না। এই অ্যামেন্ডমেন্ট-এর পর আরো জোরদার আলোচনা চলছে। আগামীতে হয়তো সেই লক্ষ্যে সবাই একজোট হয়ে এগোতে হবে। নাহলে এভাবেই মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলবে। আর আবেদন বলতে, মানুষগুলোর যে অস্তিত্ব আছে, সেটাকে সবার প্রথমে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। মানুষগুলো তো আকাশ থেকে পড়েনি বা অন্য কোথাও থেকে আসেনি। এই যে যারা ধর্ম নিয়ে এত কথা বলছে, সেই হিন্দু ধর্মেও এই মানুষগুলোর অনেক উল্লেখ আছে। তাই এরা যে অদৃশ্য নয়, এদের যে বসবাসের অধিকার আছে, সেটাই আমাদের মূল দাবি,” স্পষ্ট করলেন অরিন্দম (সুমি)।

 

অ্যাানি (সিল্ক) এই বিষয়ে নিজের দাবি যা জানালেন, “শাসক দল, তাও হঠাত করে একজন ঘোষিত সমকামী মানুষকে রাজ্যসভায় পাঠাল। আমি চেয়েছিলাম, সিপিএম বা কংগ্রেস আমাদের রাজ্যের, কোনোও একজন ট্রান্সজেন্ডার মানুষ বা এলজিবিটিকিউআইএ+ কমিউনিটির কোনোও একজন মুখকে বার করুক। কিন্তু কেউ প্রার্থী করে না, কারণ, জনগণ যে ভোট দেবে সেই কনফিডেন্স তাঁদের নেই, সেইজন্যই কেউ প্রার্থী করে না, আমি এটাই বুঝব।

 

আমি একটা কথাই বলব যে, আমরা সরাসরি পার্টিদের কাছে যেতে পারিনি, আর যারা গেছে, যারা কেন্দ্রে বা রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা পার্টির সংস্পর্শে আছে, ট্রান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডে আছে, তারা নিজেদের চাওয়া-পাওয়া নিয়েই খুশি, তারা আমাদের কথা ভাবছে না, বলেই না। সবাই এমনটাই বলে – আমি ভালো, বাকি সব খারাপ। খারাপটাকে ভালো করার দায়িত্ব কেউ নিচ্ছে না। তাই কোনোও পার্টিই আমাদের কথা ভাবে না।

 

এই অ্যাক্টটা যাতে কার্যকর না হয়, তা দেখতে হবে। অনেক কষ্ট করেছি। আর ন্যাংটো যাতে না হতে হয়, তাই দেখতে হবে, অনেক হয়েছি। সমাজে যেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারি। হিজড়া অনেক পুরনো পেশা বন্ধ করা যাবে না। নতুন যাঁরা কমিউনিটিতে আসছে যে সরকারই আসুক তাদের শিক্ষা, চাকরির ব্যবস্থা করে দিক। এটুকুই দাবি।”

 

শেষের মিছিল আর স্পষ্ট অবস্থান

 

১৫ এপ্রিল – বাংলা নববর্ষ। সেইসঙ্গে সারা দেশের রূপান্তরকামী মানুষদের জন্য এক ঐতিহাসিক দিনও বটে। ২০১৪ সালে এই দিনেই এসেছিল যুগান্তকারী নালসা জাজমেন্ট, যেখানে রূপান্তরকামীরা পেয়েছিলেন তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, নিজেদের লিঙ্গ পরিচিতি স্ব-নির্ধারণের অধিকার, যে অধিকার নতুন সংশোধনী অ্যাক্ট-কে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। গত ১৫ এপ্রিল কলকাতায় নালসা জাজমেন্ট-এর ১২ বছর উদযাপন ও ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-এর বিরূদ্ধে এক মিছিলে অংশ নেন রাজ্যের বহু ট্রান্স-ক্যুইয়ার মানুষ।

 

মিছিলে হাঁটার সময়েই কথা হয় ট্রান্স ম্যান স্যাটি-এর সঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ট্রান্স-ক্যুইয়ার মানুষদের একাংশের মধ্যে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির রং দেখা গেছিল, সেই প্রসঙ্গে বললেন, “দেখুন, কে কোন রাজনৈতিক দলকে সাপোর্ট করে, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে আমরা বুঝতে পারছি, যদি এই মুহূর্তে আমরা রুখে না দাঁড়াই, তাহলে আমাদের উপরেই প্রভাব পড়বে। আর এটা শুধু ট্রান্স অ্যাক্ট বলে নয়, আরোও যেসব আইন আনছে, এই যে এসআইআর, আমরা যারা ভাবছি যে, না, আমাদের তো কোনোও অসুবিধা হচ্ছে না, তাদেরও অসুবিধা হবে। এখন হয়তো বুঝতে পারছে না, কিন্তু কিছুদিন পর, ইফ উই লুক অ্যাট দ্য বিগার পিকচার এর একটা বড় প্রভাব পড়বে। “সিপিএম-এর ম্যানিফেস্টোতে ট্রান্স-ক্যুইয়ার মানুষদের উল্লেখ থাকলেও, প্রার্থী এবছরও দেয়নি কোনোও দল। হালকা হেসে স্যান ডি বললেন, “এখানে সিপিএম প্রতিবার, অন্য রাজ্যে অন্য দল, যেমন কংগ্রেস তাদের ম্যানিফেস্টোতে একটা করে লাইন থাকে। কিন্তু আলটিমেটলি কেউ সেটাকে কাজে লাগায় না। ওই আর কি লেখা থাকে যে আমরা সাপোর্ট করছি, কিন্তু সবাই গিয়ে একই রকম বেরোয়। ব্যাপারটা দাঁড়ায় উই হ্যাভ টু চুজ দ্য লেসার ইভিল। আমাদের একদম দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কোনটা করলে একটু হলেও বাঁচতে পারব, সেটাই চেষ্টা। আমরা ভালো থাকতে চাই, নিজেদের রাইটস নিয়ে আর পাঁচটা মানুষের মতো বাঁচতে চাই।”

 

কৌণিশ দে সরকার, ট্রান্স ম্যান পরিচিতির একজন মানুষ, এই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সমস্ত অবিজেপি দলগুলির ভূমিকা দেখার পর জানালেন, “আমরা আশাবাদী। পশ্চিমবঙ্গে ট্রান্সজেন্ডার ওয়েলফেয়ার বোর্ড ছিল। আমি নিজে সেই বোর্ডের সদস্য ছিলাম। আমি আশাবাদী যে এ রাজ্যে সংশোধনী অ্যাক্ট-এর যে রুলস তৈরি হবে, সেখানে ডেফিনেটলি আমাদের ট্রান্স ম্যানদের রাখা হবে। আমরা নিজেদের অস্তিত্ব পাব।” এ রাজ্যের ট্রান্স কমিউনিটির মধ্যে ভোটের আগেই #নোভোটটুবিজেপি চালু হয়েছিল। কৌণিশ বলছিলেন, “আমাদের অস্তিত্ব যারা পুরোপুরি ইরেজ করে দিচ্ছে, আমরা তাদের ভোট দিয়ে আনব কেন? যতজন এই মিছিলে দেখতে পাচ্ছেন, তারা কেউই বিজেপিকে ভোট দেবে না। #নোভোটটুবিজেপি এটা আমরা থাকব, থেকে যাব।”

 

একই মিছিলে হাঁটছিলেন ট্রান্স উওম্যান অপর্ণা ব্যানার্জী। ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ২০২৬, এসআইআর ইত্যাদির প্রভাব নির্বাচনে কী পড়তে চলেছে, জানতে চাওয়ায় বললেন, “অবশ্যই এর প্রভাব জনগণের ভোটে পড়তে চলেছে। ভোটের প্রাক্কালে বিজেপি সরকার এরকম বিল আনল। এসআইআর নিয়ে জীবন-মরণ সমস্যা তৈরি করে রেখেছে। এই যে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সিটিজেনশিপ, জেন্ডার আইডেন্টিটির উপর মাঝেমাঝেই খডগ চালিয়ে যাচ্ছে, বিধানসভা ভোটে তার প্রভাব তো নিশ্চয়ই পড়বে।” রাজ্যের অবিজেপি দলগুলির এক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখে তাঁদের বক্তব্য কী? “বিরোধী দল হিসাবে তারা এসআইআর, এই বিল এইসবের বিরূদ্ধেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি এমন একটা জায়গা তৈরি হওয়া উচিৎ যেখানে, এই অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে, তা বন্ধ হওয়া দরকার। #নোভোটটুবিজেপি ক্যাম্পেইন সারা দেশ জুড়েই শুরু হওয়া উচিৎ।”

 

এ রাজ্যে এই ক্যাম্পেইন নিয়ে অপর্ণার বক্তব্য, “দেখুন, স্যাফরনাইজেশন তো আছেই। যেদিন থেকে কিন্নরীফিকেশন অফ দ্য হিজড়া ঘরানা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি একটা ক্লিয়ার স্যাফরনাইজেশন-এর ধাঁচে এই সংঘ পরিবার আমাদের ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সেটার বিরূদ্ধে আমরা সবাই। এবং পশ্চিমবঙ্গে আমার মনে হয় এই বিল ও এসআইআর-এর পরে যদি কোনোও মানুষ স্যাফরন শিবিরে দাঁড়িয়ে কথা বলে, তাহলে তার চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না।”

 

আর্টেস, একজন ট্রান্স মহিলা মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “তৃণমূল কংগ্রেস বলেছিল তারা ট্রান্স বিল-এর বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছে। এই অ্যাক্ট বিধানসভা নির্বাচনে কতটা বড় ফ্যাক্টর হবে জানি না। তবে এসআইআর নিঃসন্দেহে একটা বড় রোল প্লে করবে। আমার মনে হয় না, মেইনস্ট্রিম-এ কোনোও পার্টিই ট্রান্স অ্যাক্ট-এর মতো একটা ড্র্যাকোনিয়ান অ্যাক্ট-কে এ রাজ্যের নির্বাচনের আগে গুরুত্ব দিল। হুইচ ইজ ভেরি ডিসহার্টেনিং টু সি।” গুরুত্বপূর্ণ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তিনি যে, ট্রান্স-ক্যুইয়ার মানুষদের সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহে ফাঁক রয়ে যায় বড় রকম। সরকারিভাবে ব্যবহার হয় পুরনো পরিসংখ্যান। বাদ পড়ে যান অসংখ্য প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌন পরিচিতির মানুষ প্রয়োজনীয় নথির অভাবে, সঠিক প্রক্রিয়ার অভাবে।

 

ট্রান্স ম্যান ঈশান মনে করেছেন, ট্রান্স অ্যাক্ট ২০২৬, এসআইআর প্রভাব অবশ্যই বিধানসভা ভোটে পড়তে চলেছে। “কেন্দ্রীয় সরকার ট্রান্স ভাইবোনেদের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করছে, স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসাবে তাঁদের মৌলিকত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে, ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করছে। তার প্রভাব এ রাজ্যের নির্বাচনেও পড়বে। আমি মনে করি সমস্ত রাজনৈতিক দলকে প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌন পরিচিতির মানুষদের নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। বাড়ি থেকে বিতাড়িত, ডকুমেন্টস কেড়ে নেওয়া এই গোষ্ঠীর মানুষদের এসআইআর-এ অসম্ভব সমস্যা হয়েছে, নাম বাদ গেছে – এই বিষয়টা যে দলই ক্ষমতায় আসবে তাঁদের দেখা উচিৎ।” কোনোও দলই এই গোষ্ঠী থেকে প্রার্থী যে এ বছরও দাঁড় করাননি, তা নিয়ে বলতে গেলে বিষণ্ণ হাসি দেখা দেয় ঈশানের গলায়, “কোনোবারই কেউ দেয় না। ওনারা আমাদের মানুষের পর্যায়ে ফেলেন কি না বলতে পারব না! তবে আমি জোর গলায় বলতে পারি ট্রান্স ভাইবোনেদের নমিনেশন দেওয়া হলে তাঁরা পুরোপুরি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।”

 

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৬-এর ফলাফল প্রকাশিত হবে ৪ মে। এ রাজ্যের এক বড় সংখ্যক জনগোষ্ঠী নিজেদের প্রান্তিক পরিচয়ের কারণে নাগরিকত্ব হারানো থেকে, আত্ম-পরিচিতির অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে পড়া – এই সবের নিরিখে নিজেদের রাজনৈতিক পথ স্থির করেছেন, গত এক মাস ধরে এই প্রতিবেদন বিভিন্ন পর্যায় ধরে তৈরি করার মাঝে সেই বাস্তব চিত্রই উঠে এল।

 

 

Share this
Leave a Comment