ডিলিটেড ভোটারের চোখে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৬ (২)


  • April 19, 2026
  • (0 Comments)
  • 162 Views

নথি থাকা সত্ত্বেও কেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ নিজেদের ভোট দিতে পারবেন না, উত্তর চান নাম বাদ যাওয়া ভোটারেরা

 

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন

 

সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থান, শহর-গ্রাম-মফস্বল, জাতি-বর্ণ-ধর্ম, লিঙ্গ পরিচিতি সব পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের এক বিশাল অংশ আজ ডিলিটেড ভোটার। তাঁদের চোখে এই নির্বাচন ঠিক কেমন? 

 

মর্জিনা বিবি, গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের নীচের বাসিন্দা, আগে কাগজ কুড়িয়ে ও বর্তমানে ছোটখাটো কাজ করে জীবন নির্ধারণ করেন 

 

 

“মরলে এখানে মরব, বাঁচলে এখানে বাঁচব। আমাদের জন্ম-কর্ম এখানে। আমরা বাচ্চাও জন্ম দিয়েছি এখানে। মা-বাবাও আছে। তাদের ভোটের কার্ড আছে আর আমাদের ভোটের কার্ড ডিলিট হয়ে যাচ্ছে। সব করেও কিছু না হলে, আমাদের নিয়ে যাবে বললে তো আর আমরা চলে যাব না।

  

ভোটের মুখেমুখে এসআইআরটা করেছে মানে মোদী জিতবে বলে করেছে। ভেবেছে যে নাম বাদ দিয়ে দেব।

 

আমাদের তো কষ্ট হচ্ছে যে আমরা এবার ভোট দিতে পারছি না। কেন পারব না? এখন বলছে ২০০২-এর দেখাও। এরপর বলবে ২০২৬-এর দেখাও, ভোট না দিতে পারলে কী করে কী দেখাব? তখন আমাদের মেয়ে, আমার বাচ্চাটা কী করে দেখাবে? বলতেই পারে। কেউ কী ভাবতে পেরেছিল ২০০২-এর ডকুমেন্টস লাগবে!

 

আমার ৫, ৬ বার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। কলকাতাতেই আমার মা-বাবা ছিল। আসল বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগণার লক্ষ্মীকান্তপুর লাইনে। পেটের জ্বালায়…গরীব মানুষ, খেটে খেতে হবে, যারজন্য এখানে এসে খাটা-খাটনি করত। বাবা মারা গেছে, এখানে থেকে, আমাদের জন্ম দিয়ে। এবার আমরা বড় হয়েছি, আমাদেরও বাচ্চা-কাচ্চা আছে। আমরাও ভোটে নাম দিয়েছি এখানে। আমাদের আধার কার্ড, ব্যাঙ্কের বই সব করেছি, ভোটার কার্ডও করে নিয়েছি।

 

আমার বাড়িতে শুধু আমার নামই বাদ গেছে। বলছে যে আমার কারোর কোনো প্রমাণই পাচ্ছে না, ২০০২-এর। কিন্তু আমি দেখাচ্ছি যে, ২০০২-এর আছে আমার জ্যাঠাদের। ২০০৩-এ আছে, আমার মা-রা ভোট দিত, আমার বাপের বাড়িতে, ২০০৩-এর আছে। তাহলে আর কী দেখতে চায়?

 

ওখানে তো আমাকে হিয়ারিং-এ ডেকেছে। ডাকতে আমি দেখাচ্ছি কাগজপত্র, বলে এসব কিচ্ছু দেখাতে হবে না। আমার নিজের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড – সব দেখাচ্ছি। যখন দেখাচ্ছি তখন বলছে, আর কিছু দেখাতে হবে না, এগুলো দেখালে হয়ে যাবে।

 

আমরা তো মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ, আমরা তো ফোনে কিছু চেক করতে পারি না। আমরা একদিন বিএলও-কে ফোন করেছি, ফোন করতে বলে, ডিলিট হয়ে গেছে! তা যখন ডিলিট হয়ে গেছে, আমাদের তো একবারও জানায়নি। আমরা এর আগেও একবার গেছি। আমাদের বলল যে, ঠিক আছে তোরা যা, তোদের সেরকম যদি কিছু হয়, আমরা জানিয়ে দেব। আমরা সবাই গিয়ে ফিরে এসছি। তারপরে অন্যান্য জন চেক করছে, বলছে যে, ওই তোদের নাম তো ডিলিট হয়ে গেছে! তারপরে আমরা ফোন করেছি। তখনই বলছে তোদের এই ক’জনের নাম ডিলিট হয়ে গেছে। প্রথমে আমাদের হিয়ারিং-এ ডেকেছে, তারপর ডিলিট করে দিয়েছে।

 

ফর্ম ফিল আপ করে আমরা অনলাইনে জমা দিয়েছি। এখনোও কোনোও খবর পাইনি। ওদেরকে বলছি, আমরা মুখ্যু মানুষ, পড়াশোনা জানি না, দেখাচ্ছি যে ২০০২-এর জ্যাঠাদের, ২০০৩-এর মায়েদের, ওরা ধরছেই না কিছু। আমরা তো কিছুই জানি না। খুব কঠিন এসব, যা হচ্ছে। কেন যে হচ্ছে জানি না। মুসলমান, বাঙালি, হিন্দু – সবার নাম কাটছে। কেন? সে সরকারই জানে! এটা ভোটের পরে করতে পারত। তাহলে মানুষ কিছু একটা করতে পারত। কারণ ভোট আসতে পাঁচ বছর সময় লাগে। ভোটের পরে করলে কিছু ভুল থাকলে মানুষ সংশোধন করতে পারত। এখন ভোটের মুখে মানুষ কী করে সংশোধন করবে?”

 

রশিদা বিবি, গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের নীচের বাসিন্দা, কাগজ কুড়িয়ে জীবিকা নির্ধারণ করেন

 

 

আমরা তো ভোটার আমাদের নামটা কেন বাদ যাবে? কীসের জন্য বাদ যাবে? আর আমরা এই ভোটটা দেব না কেন? কেন দেব না? আমাদের তো অধিকার এইটা। আমরা দেব না কেন? আমাদের বাদ দিল কেন? কীসের জন্য বাদ দিল সেইটা তো আমাদেরকে বলবে, যে এইজন্য বাদ দিয়েছি।

 

এই যে মানুষগুলোকে বাদ দিচ্ছে, আমার মনে হয় না ঠিক। আমার মনে হয় এটা ভুল। ভোটটাও কিন্তু এখন করাটা ঠিক হচ্ছে না। যদি ভোটটা করার হত, তাহলে এসআইআর-টা পরে করতে পারত। এটুকু সময় হাতে নিয়ে এসআইআর করছে, এত লোককে বাদ দিচ্ছে, কত লোক ভয়েতে মারা গেছে। কত লোক আত্মহত্যা করেছে। তাহলে সেগুলোর দায়িত্ব কে নেবে?

 

আমাদেরকে কিচ্ছু বলে বাদ দেয়নি। কী কারণে নাম বাদ গেল সেটা বলছে না। আমরা যখন ফর্ম ফিল আপ করে জমা দিয়েছি…, আমাদের বাবা-মা তো কবে মারা গেছে, তখন তো অনেক ছোট ছোট অত বুঝতে পারিনি। আমার ২০০২ সালে ভোটার লিস্ট নেই। দাদাদের আছে। দাদাদেরটা দিয়েছে। আমার বাড়িতে আমার নাম বাদ গেছে। দাদা, বৌদি সবার নাম এসেছে। আমার ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড – এই ডকুমেন্টসগুলো দিয়েছি। দেওয়ার পরেও যদি আমাদের নাম বাদ যায়, তাহলে আমরা কী করব? কোথায় যাব? কার কাছে গিয়ে বলব আমরা যে আমাদের নামটা কাটা গেছে?

 

আমরা অনলাইন দিয়ে আবার অ্যাপ্লাই করেছি। আমাদের একজন আছে, ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে, আবার অ্যাপ্লাই করেছি, এখন কী হবে, জানি না। যদি তাতেও নাম না ওঠে, তাহলে লাস্টে বাধ্য হয়ে কোর্টে যাব।

 

ওরা তো বেছে বেছে বাদ দিচ্ছে। মুসলিম বেশি বাদ গেছে। তার মধ্যে আমিও মুসলিম। আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। বর নেই। মেয়ে দু’টোর বিয়ে হয়েছে, ছেলেটার বিয়ে হয়নি। আমার পরিচয় পত্র না থাকলে, ছেলেমেয়ের পরিচয় পত্র কোথা থেকে আসবে? আমি লড়াই করব সামনের দিনে। লড়াই ছাড়া আমাদের জীবনে আর কী আছে!”

 

মেলিসা খাতুন, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

অতি অবশ্যই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যেদিন থেকে এই ডিলিটেড-এর নোটিস এসেছে আমার বাড়ির লোক ও আমি খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে আছি। আমার তো সব নথি আছে তাও আমার নাম ডিলিটেড। এরকম অনেক মানুষ আছেন যাঁদের এত নথি নেই। তাহলে তাঁদের কী হবে?

 

আমি তো খুবই অবাক হয়েছিলাম। যে আমার তো সবই ডকুমেন্টস আছে। তা সত্ত্বেও আমি কেন ডি-ভোটার হলাম! আমার সবকিছু সব জায়গায় ভেরিভাই করা আছে। আমি একজন সরকারি চাকুরিজীবী এবং বার্থ সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে, সমস্ত ডকুমেন্টসই আমার আছে – আধার কার্ড, রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, সমস্ত পরীক্ষার সার্টিফিকেট। তা সত্ত্বেও ভোটার লিস্টে আমার নাম প্রথম যখন আন্ডার অ্যাডজুডিক্রশিন এল, আমি একটু অবাকই হলাম। তারপরও যখন হিয়ারিং-এ ডাকা হল, যেসব নথি চাওয়া হল, আমি নিজে সব গিয়ে জমা দিয়ে এসেছি। এই ৭ তারিখে আমাদের লিস্ট বেরিয়েছে আমাদের বুথে, তো সেইখানে দেখছি আমার নাম ডিলিটেড।

 

ওরা নোটিসে লিখে দিয়েছিল কী কী ডকুমেন্টস জমা দিতে হবে, যে নোটিস আমাকে বিএলও লিখে দিয়েছিলেন। সেখানে আমার বার্থ সার্টিফিকেট, আধার কার্ড, মাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেট, আমার বাবার ভোটার কার্ড, আমার বাবার আধার কার্ড – এইগুলোই জমা দিয়েছিলাম। আমার ভোটকেন্দ্র পূর্ব বর্ধমানের খন্ডঘোষ। আমার পরিবারে শুধু আমার নামই ডিলিটেড।

 

২০০২-এ আমি ভোটার ছিলাম না। আমার নামের লিঙ্কেজ আমার বাবার সাথে হওয়ার কথা। কিন্তু বিয়ের পর, খন্ডঘোষ যেখানে আমার শ্বশুরবাড়ি, সেখানকার ভোটার হয়েছি। তো আমার নোটিসে এসেছিল, আমার বাবার যে নাম আছে ভোটার লিস্টে ২০০২-এ, ওখানে ছ’জনের নাম লিঙ্ক আছে, আমার বাবার নামের সাথে। ওইজন্য আমাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে।

 

একটা তো আমাদের যৌথ সিদ্ধান্ত হবে যে আমরা কী করব। আমাদের এখন বলছেন নির্বাচন কমিশন থেকে যে ট্রাইবুনালে যাওয়ার, সেটা আপাতত আবেদন করে রাখাটাই সুরক্ষিত বলে মনে করি। ডিলিটেড যে নামের লিস্ট আমি আমাদের বুথে দেখেছি, সেখানে অধিকাংশই বলতে পারেন সংখ্যালঘু।”

 


 

পড়ুনঃ ডিলিটেড ভোটারের চোখে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৬ (১)

 

 

Share this
Leave a Comment