আন্দোলন ছিল অনিবার্য। স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভই ছিল নিয়তি। কোনও পার্টি/সংগঠন/ইউনিয়নের অনুপস্থিতিতে আন্দোলনের মুখ্য চরিত্র এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক। প্রতিবাদ/প্রতিরোধহীন শোষনে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের পক্ষে কোনও না কোনও সময়ে প্রত্যাঘাত করাই ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা।
কৌশিক
দেশে চলমান শ্রমিক আন্দোলন বা বিক্ষোভ এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ভারতবর্ষে উত্তাল চল্লিশের দশকেও এমন বিস্তৃত ভূখন্ডে শ্রমিকদের আন্দোলন দেখা যায় নি। যে সত্তর দশক মুক্তির দশক হিসেবে এখনও নস্টালজিয়ার শিরশিরানি বয়ে আনে তখনও তার দেখা মেলে নি। তারপর আদিগন্ত বিস্তীর্ন মরুভূমি। কখনও সখনও সেখানে অনিবার্য ভাবে মরুদ্যান বা তার মরীচিকা… … সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর…. দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর সবুজ ঘাসের দেশ নজরে পড়ছে কি?
শ্রমিক এবং শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে ফারাকটা আসমান জমিনের। ব্যক্তি মজুরি-শ্রমিক ও পুঁজির মালিক প্রতি নিয়ত দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে। কিন্তু সে সংগঠিত না হলে পুঁজিপতি/পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে কার্যকরি লড়াই গড়ে তুলতে পারে না। আধুনিক কারখানা নির্ভর উৎপাদনে নিয়োজিত থাকে বহুসংখ্যক শ্রমিক ফলে এক আধজন শ্রমিকের বিরোধ বা লড়াই সেই উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যহত করতে অক্ষম। শ্রেণি বিভাজিত সমাজে প্রত্যেকের ব্যক্তি পরিচয়ের পাশাপাশি থাকে শ্রেণি পরিচয়। শ্রেণি পরিচয় জন্মগত নয়, তার ভিত্তি উৎপাদন সম্পর্কের অধীন। সেই সম্পর্কের অধীনেই সংগঠিত হওয়া এবং শ্রেণি দ্বন্দ্বের বিকাশ ঘটানোর মধ্যে দিয়েই ধীরে ধীরে সে তার শ্রেণির পরিচয়কে রুপ দিতে থাকে। পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রামই তার শ্রেণির স্বার্থ, শ্রেণির চেতনাকে বিকশিত করতে সাহায্য করে। শ্রেণি বিভক্ত সমাজে এই যুদ্ধ চলতে থাকে নিরন্তর। উনিশ শতকে কারখানা ভিত্তিক বড় আকারের পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশ এই দ্বন্দ্বকে ধারাবাহিক ভাবে উপস্থিত ও বিকশিত করেছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। বস্তুত বুর্জোয়া সমাজে এই দুই শ্রেণির দ্বন্দ্ব ও সংঘাত গত পৌনে দুশো বছরে সামাজিক, রাজনৈতিক ইতিহাসের অপরিহার্য অঙ্গ। The moment the workers resolve to be bought and sold no longer, when, in the determination of the value of labour, they take the part of men possessed of a will as well as of working-power, at that moment the whole political economy of today is at an end.(১)।
৮ ঘন্টার শ্রম দিবস উপহার নয় – উনিশ শতকে শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব সংগঠন ও সংগ্রাম
“What is a working day? It has been seen to this questions capital replies: the working day contain full 24 hours. Hence it is self-evident that the labourer is nothing else, his whole life through, than labour power. In its blind unrestrainable passion, its were wolf hunger for surplus labour, capital oversteps not only the moral, but even the merely physical maximum bounds of the working day” – Karl Marx, capita vol 1, pg 252 Progress publisher.
মেলবোর্ন শহর ১৮৫৬, নির্মান শ্রমিকরা যন্ত্রপাতি নামিয়ে রাখল। দীর্ঘ ২০ বছরের ৮ ঘন্টা শ্রম দিবসের লড়াই তখন সংগঠিত আকার নিয়েছে। মালিকরা পিছু হটল, পৃথিবীতে শ্রমিক শ্রেণি প্রথম ৮ ঘন্টা শ্রম দিবস হাসিল করল (২)। এই লক্ষ্যে ইংল্যান্ডে ১৮১০-১৮১৫ থেকেই শ্রমিকদের গোপন সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। কেন্দ্রীয় দাবিগুলো ছিল শ্রম দিবস হ্রাস, মজুরি বৃদ্ধি, শিশু শ্রমের অবসান, স্বাস্থ্য এবং কাজের পরিবেশের উন্নতি। কিন্তু দেখা যাবে শ্রম দিবস হ্রাসের দাবি সব দাবিকে ছাপিয়ে গেছিল। তৎকালীন বিকাশমান পুঁজিবাদী দেশগুলিতে শ্রম দিবস ছিল ১৫-১৬ ঘন্টা। মহিলা ও শিশু শ্রমিকরাও ছিল অমানুষিক, জান্তব শোষনের স্বীকার। উনিশ শতকীয় ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির অসামান্য সামাজিক, মানবিক চিত্রায়ন ধরা আছে Engels-র Condition of Working Class in England-এ। Engels লিখছেন –
The most extensive working-people’s district lies east of the Tower in Whitechapel and Bethnal Green, where the greatest masses of London working-people live. Let us hear Mr. G. Alston, preacher of St. Philip’s, Bethnal Green, on the condition of his parish. He says:
“It contains 1,400 houses, inhabited by 2,795 families, comprising a population of 12,000. The space within which this large amount of population are living is less than 400 yards square (1,200 feet), and it is no uncommon thing for a man and his wife, with four or five children, and sometimes the grandfather and grandmother, to be found living in a room from ten to twelve feet square, and which serves them for eating and working in. If we really desire to find out the most destitute and deserving, we must lift the latch of their doors, and find them at their scanty meal; we must see them when suffering from sickness and want of work; and if we do this from day to day in such a neighbourhood as Bethnal Green, we shall become acquainted with a mass of wretchedness and misery such as a nation like our own ought to be ashamed to permit”.
সেই গ্রন্থেই শ্রমিকদের শারীরিক ক্ষয় নিয়ে লিখছেন –
This distortion usually consists of a curving of the spinal column and legs, and is described as follows by Francis Sharp, M.R.C.S., of Leeds:
“Before I came to Leeds, I had never seen the peculiar twisting of the ends of the lower part of the thigh bone. At first I considered it might be rickets, but from the numbers which presented themselves, particularly at an age beyond the time when rickets attack children (between 8 and 14), and finding that they had commenced since they began work at the factory I soon began to change my opinion. I now may have seen of such cases nearly 100, and I can most decidedly state they were the result of too much labour. So far as I know they all belong to factories, and have attributed their disease to this cause themselves. Of distortions of the spine, which were evidently owing to the long standing at their labour, perhaps the number of cases might not be less than 300.”
এই বিবরণ অকাট্য ভাবে তুলে এনেছে দীর্ঘ শ্রম দিবসের মারণ ফলাফল। এর বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড, ইউরোপ এবং আমেরিকার শ্রমিকরা সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে গড়ে তুলতে লাগল ট্রেড ভিত্তিক ইউনিয়ন। ১৮২৬ অবধি ইংল্যান্ডে ইউনিয়ন করা ছিল আইনত অপরাধ। সেই বছরে বস্ত্র শ্রমিকদের সংগঠিত ধর্মঘট ও তার সংগঠনকে বেআইনি ঘোষনা করতে ভয় পেয়েছিল সরকার। ১৮৪৪-এ ৪০,০০০ খনি শ্রমিকদের দেড়মাস ব্যাপী ধর্মঘটকেও বেআইনি ঘোষনা করতে পারে নি সরকার। এভাবেই ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট ট্রেড ভিত্তিক সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। ১৮৭১-এ ইঞ্জিনিয়ানিং শিল্পে ৯ ঘন্টার দাবিতে শ্রমিকরা দীর্ঘ পাঁচমাস হরতাল সংগঠিত করে এবং মালিকপক্ষ ও সরকারকে নতি স্বীকারে বাধ্য করে। সেই বছরেই তৈরি হয় Labour Representation Committee, যা জাতীয় স্তরে শ্রমিকদের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে একই ছাতার তলায় নিয়ে আসে। জাতীয় স্তরে সম্মিলিত দাবি দাওয়া তুলে আনে। যার সর্বাগ্রে ছিল ৮ ঘন্টা শ্রম দিবসের দাবি। সেই সংগঠনই পরিবর্তিত হয় ব্রিটেনের লেবার পার্টিতে। ইংল্যান্ডের চিরশত্রু ফ্রান্সেও শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে অর্জিত হয় ৮ ঘন্টা শ্রম দিবস। মজা হল এই ‘চিরশত্রুতা’ কিন্তু দুই দেশের শ্রমিক আন্দোলনে কোনও প্রভাব ফেলতে পারে নি শুধু নয়, ১৮৬৪ থেকে ইউরোপের বহু দেশের শ্রমিকদের জাতীয় স্তরের সংগঠনগুলি শ্রমিকদের প্রথম আন্তর্জাতিক গড়ে তোলে। ফ্রান্সের শ্রমিক শ্রেণি ছিল আরও অগ্রসর যার ফলে তারা অর্থনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইকেও সামনে নিয়ে আসে। খেয়াল করা জরুরি প্রথম আন্তর্জাতিকের সভাপতি ছিল ইংল্যান্ডের শ্রমিক জর্জ ওয়েডগার কোনও মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবি নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৩৫-এ ফিলাডেলফিয়ার শ্রমিকরা প্রথম ১০ ঘন্টার দাবিতে ধর্মঘটে সামিল হয়। সেই লড়াই দেশময় ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের আন্দোলোয় তাদের প্রেরণা যোগায় ৮ ঘন্টার দাবিকে সামনে নিয়ে আসতে। ১৮৮৬-র ১-লা মে শিকাগোর শ্রমিকদের উপর সরকারের বর্বরতা আজ ইতিহাস। সেই ঘটনা ১-লা মে তারিখটাকে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবসের মর্যাদা দিয়েছে। ১৯৯০-তে ফ্রান্সের শ্রমিকরা সেই মে দিবসেই ৮ ঘন্টার দাবিকে জোরাল ভাবে সামনে নিয়ে আসে। তাদের স্লোগান ছিল “৮ ঘন্টা শ্রম দিবস, ১-লা মে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস”। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা, চর্চার প্রয়োজন আছে যা এই পরিসরে সম্ভব নয়।
দেখা যাচ্ছে উনিশ শতকের দ্বিতীয়/তৃতীয় দশক থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে ৮ ঘন্টার দাবিতে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন স্থানীয় স্তর, নির্দিষ্ট ট্রেড থেকে ক্রমে জাতীয় স্তরে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল এই সংগ্রাম মূলত গড়ে উঠেছিল শ্রমিকদের নিজস্ব উদ্যোগে। আন্দোলনগুলো উনিশ শতকের প্রান্তে গিয়ে পরিণত রুপ ধারণ করে এবং অবশ্যই তাতে দেশে দেশে সোশ্যালিস্ট/কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য কিন্তু সেই পার্টিগুলো তৈরি হতে থাকে সাত/আটের দশকে। তার বহু পূর্বেই শ্রমিকদের নিজস্ব উদ্যোগে সংগঠন ও সংগ্রাম নিজ নিজ দেশের জাতীয় স্তরে উন্নীত হয়ে গেছিল। এর সহজাত ও স্বঃতস্ফূর্ত চরিত্র ধরা আছে Engels-র ওই গ্রন্থে।
“The spontaneous, instinctive movements of these vast masses of working people, over a vast extent of country, the simultaneous outburst of their common discontent with a miserable social condition, the same everywhere and due to the same causes, made them conscious of the fact, that they formed a new and distinct class”
সোভিয়েত রাশিয়ায় শ্রমিকদের নিজস্ব উদ্যোগেই তৈরি হয় শ্রমিকদের সোভিয়েত। সেই সোভিয়েতগুলো অর্থনৈতিক গন্ডি পার করে রাজনৈতিক দাবিদাওয়া সামনে নিয়ে আসতে থাকে। একটা সময় তারা বলশেভিক বা মেনশেভিক এমন বিবিধ পার্টির ছাতার তলায় সমবেত হতে থাকে। কিন্তু খেয়াল রাখা জরুরি এই পার্টিগুলোর দেশব্যাপী প্রভাবের আগেই শ্রমিকরা নিজেদের উদ্যোগেই গড়ে তুলেছিল সেই আধার মানে ‘সোভিয়েত’ যা পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর দিশারি হয়ে ওঠে।
বিংশ শতকের প্রথম দশকগুলিতে শ্রমিক আন্দোলনের চরিত্র ও প্রসার
এই শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে দেশে দেশে ৮ ঘন্টা শ্রম দিবস স্বীকৃত হতে থাকে। এর পিছনে দুটি কারণকে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
১) ইউরোপে ১৮৭০-৮০ থেকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টীগুলি জন্ম নিতে থাকে। সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত পার্টিগুলির শিরদাঁড়া ছিল শ্রমিক শ্রেণি এবং তাদের ইউনিয়ন। উনিশ শতকের শেষভাগে একচেটিয়া পুঁজির উদ্ভব বুর্জোয়া সরকারগুলিকেও প্রচুর পরিমানে নিয়ন্ত্রন করতে থাকে। বাড়তে থাকে সরকারি নীতির উপর তাদের প্রভাব। ফলে শ্রমিক আন্দোলনেরও প্রয়োজন ছিল জাতীয় স্তরে প্রভাব বিস্তার করার মত একটি রাজনৈতিক শক্তির। ফলে এই ধরনের পার্টিতে তাদের সমাবেশ ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। ব্রিটেনে ১৮৮৭-তে ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল ৬.৭৫ লাখ যা ১৯০৫-এ দ্রুত হারে বেড়ে আনুমানিক ২০ লাখে পৌঁছে যায়। ফ্রান্সে ১৮৯৩ সালে ইউনিয়ন কার্ডধারীদের সংখ্যা ১.৩৫ লাখ থেকে পাঁচগুন বৃদ্ধি পেয়ে ১৯০২ সালের মধ্যে ৬.২০ লাখে পৌঁছে যায়। সেই কালখন্ডে জার্মানিতে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস আরও চমকপ্রদ। ১৮৯০ থেকে মাত্র ২০ বছরে ১ লাখ থেকে লাফ দিয়ে বেড়ে ৯ লাখে পৌঁছে যায়(৪)। শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি নয় তার তাৎপর্য ছিল নতুন নতুন ট্রেডের শ্রমিকদের এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্যেও। এই শ্রমিকদের একটা বড় অংশ পার্টির সদস্য হতে শুরু করে। অর্থাৎ শ্রমিক এবং মেহনতি মানুষরা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের গন্ডির বাইরে এসে দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহন করতে থাকে। বুর্জোয়া সরকারের বিভিন্ন জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে থাকে। এই ঘটনার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মানুষের ইতিহাসে এই প্রথম শ্রমজীবি জনতা রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করতে শুরু করল। নিজেদের আশু সমস্যার বেড়া পার হয়ে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্যে সংগ্রামে অগ্রসর হতে লাগল।
২) এই পার্টিগুলি তাত্ত্বিক ভাবে মার্কসবাদকে গ্রহন করেছিল। স্বভাবতই workers of the world unite এই স্লোগানের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল, বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাককাল অবধি। সেই তত্ত্বের দাবি অনুযায়ী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিগুলি প্রতিষ্ঠা করে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের। আন্তর্জাতিকের প্রতিষ্ঠা বিভিন্ন দেশের জাতীয় বা কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির সংযুক্তি ঘটাতে থাকে। ১৮৮০-তে প্রতিটি শিল্পে ও বানিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শাখার ‘আন্তর্জাতিক ট্রেড সচিবালয়’ আত্মপ্রকাশ করে। এই কেন্দ্রীকরণের ধারায় ১৯১৩-তে গঠিত হয় International Trade Union Federation (IFTU)। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের সমস্ত শাখার জাতীয় স্তরের ট্রেড ইউনিয়নগুলি একটি ছাতার তলায় একত্রিত হতে থাকে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের এই ভূমিকা শ্রমিক আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে। সাংগঠনিক প্রচার ও আর্থিক জোর শ্রমিকদের ধর্মঘটের পথে যাওয়ার রাস্তাকে সুগম করে। আন্তর্জাতিক ভাবে সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণির সেই জোর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানে International Labour Organisation গঠনে ছিল নির্ধারক। ১৯১৯-এ ILO-র প্রথম কংগ্রেসেই ৮ ঘন্টা কাজের স্বীকৃতির সনদে ৪৮টি দেশ(৩) গ্রহন করছিল। দেখা যাবে ১৯২২-র মধ্যে সমগ্র ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশে ওই কংগ্রেসের সনদ অনুযায়ী বা শ্রম আন্দোলনের ফলে ৮ ঘন্টা কাজ স্বীকৃতি লাভ করে। বোঝাই যাচ্ছে এই দাবি সেই সময়ে দেশীয় গন্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিল। এর পিছনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রভাব অনস্বীকার্য কিন্তু এর সোপান তৈরি করেছিল প্রথম আন্তর্জাতিকের শ্রমিকদের নিজস্ব সংগঠনগুলি।
তৃতীয় আন্তর্জাতিক, উপনিবেশের পার্টি এবং শ্রমিক শ্রেণির অগ্রগতি/অধোগতি
তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠিত হয় ১৯১৯-এ। সফল সোভিয়েত বিপ্লব এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভাবনীয় ক্ষয়ক্ষতি মেহনতি মানুষ, গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়া এবং শিক্ষিত সমাজের একাংশকে সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট করল। সফল সোভিয়েত বিপ্লব বলশেভিক পার্টিকে এর অবিসংবাদী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তৃতীয় আন্তর্জাতিকের সবচেয়ে উজ্জ্বল বৈশিষ্ট ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে উপনিবেশের শ্রমিক শ্রেণি সহ অগুন্তি মেহনতি মানুষের সংগ্রামকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসা। ঔপনিবেশিক শোষনের অবসানই যে গোটা বিশ্ব পুঁজিবাদের ভিত নড়িয়ে দিতে সক্ষম সেই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল দক্ষতার সঙ্গে। পুঁজিবাদ যে নির্দিষ্ট কোনও দেশের গন্ডির মধ্যেই আবদ্ধ নয় এবং তা যে এক বিশ্ব অর্থনীতির অবিচ্ছিন্ন চালিকা শক্তি সেই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিল। স্বভাবতই এর বিরুদ্ধে উপনিবেশের কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি করতে সাহায্য করা বা সদ্য প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলিকে নানা ভাবে সহায়তা প্রদান করা ছিল তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনও সন্দেহ নেই তৃতীয় আন্তর্জাতিক যা কমিনটার্ন নামেই অধিক পরিচিত, উপনিবেশের দেশগুলিতে মেহনতি মানুষের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, দেশীয় বুর্জোয়া-জমিদার রাজ বিরোধী সংগ্রামে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছিল। এই সত্যকে কোনও ভাবেই লঘু করা চলে না।
উপরোক্ত বৈশিষ্ট কিন্তু সমস্যাহীন ছিল না। সংগ্রাম ও সংগঠনে ইউরোপে শ্রমিক শ্রেণির যে নিজস্ব ভূমিকা আমরা দেখলাম সেই চরিত্রের অভাব কিন্তু আমাদের মত দেশে সূচনা পর্ব থেকেই লক্ষনীয়। এমন নয় আমাদের দেশে শ্রমিক শ্রেণির উদ্যোগ ও সংগ্রামী মনোভাবে অভাব ছিল। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় ১৮৯০-তে বোম্বাই শহরে এন.এম.লোখান্ডের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল সুতাকল শ্রমিকদের প্রথম সংগঠন। সেটি ছিল দেশে শ্রমিকদের প্রথম সাংগঠনিক আত্মপ্রকাশ। এমনকি যে AITUC আজ দেশের অন্যতম বড় কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন, তার জন্ম হয়েছিল ১৯২০-এ তখনও কমিউনিস্ট পার্টি মাতৃ গর্ভে। কিন্তু অচিরেই CPI গঠিত হওয়ার পর AITUC তার অধীনস্থ হয়ে পড়ে। অচিরেই শ্রমিকদের নিজস্ব উদ্যোগ ইউনিয়ন গঠন ও সংগ্রাম সংহত করা প্রতিস্থাপিত হয় পার্টির নেতৃত্ব দ্বারা। পার্টির ভূমিকা ইউনিয়ন গঠন ও শ্রমিক শ্রেণির সংগঠনের বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছিল। ১৯৪৫-৪৬ পর্বে রেজিস্ট্রিকৃত ইউনিয়নের সংখ্যা ছিল ১০৮৭ যা দুদশকের মধ্যে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৬৮৬-তে এবং ১৯৮১-তে তার সংখ্যা ছিল ৩৫৬১৪-তে(৫)। মাত্র ৩৫ বছরে ৩৫ গুন বৃদ্ধি এক অভাবনীয় ঘটনা! কমিউনিস্ট পার্টি ব্যতিরেকে যা ছিল অসম্ভব। কিন্তু এর অপর দিকটিও বিবেচনার মধ্যে রাখা জরুরি।
তৃতীয় আন্তর্জাতিকের ভাষ্যে প্রবল গুরুত্ব লাভ করেছিল পার্টির ভূমিকা। তৃতীয় কংগ্রেসে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও বিস্তারের প্রশ্নে ঘোষিত আদর্শ ছিল The party is the vanguard of proletariat। পার্টির ভিত্তি হবে সচেতন, লড়াকু শ্রমিক শ্রেণি সহ মেহনতি মানুষ। তাদের সংগ্রাম ও সংগঠনের মধ্যে দিয়েই পার্টি জাতীয় জীবনে প্রভাব বিস্তার করবে। এটাই ছিল মডেল। এই মডেলে সমস্যার কেন্দ্রে থেকে যায় পার্টির ‘Vanguardism’। অর্থাৎ কোথায়, কখন, কী ভাবে সংগঠন, সংগ্রাম নির্মিত হবে তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পার্টি ঘাড়ে তুলে নেয়। তাছাড়া ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে প্রত্যেকটি পার্টি তৈরির মূল কারিগর ছিল পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি। সেই ট্রাডিশন অনুসারে আমাদের দেশেও দেখা যাবে পার্টিতে তারাই ছিল চালিকাশক্তি। CPI-র প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটির ২২ জন সদস্যের মধ্যে কেউ-ই শ্রমিক বা গরীব কৃষক শ্রেণি থেকে আগত নয়। ১৯৫৩-তে তৃতীয় কংগ্রেসে ৩৫ জন নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না কোনও শ্রমিক বা কৃষক ঘরের সন্তানকে। এই দুটি চিত্র প্রমান করে সূচনাপর্ব থেকেই পার্টিতে পেটি বুর্জোয়াদের প্রভাব ছিল নিরঙ্কুশ। এই তালিকা কোনও ভাবেই পার্টির আন্তরিকতা, সংগ্রামী মেজাজ, শ্রমিক শ্রেণি সহ মেহনতি মানুষের পাশে থাকার দায়বদ্ধতার অভাবের প্রমান নয়। বস্তুত পক্ষে শ্রেণি সংগ্রাম, পার্টির চরিত্র, শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে তার প্রভাব এবং শ্রেণি রাজনীতিকে কেন্দ্রে ধারন করার প্রশ্নগুলি দ্বান্দ্বিক, জটিল একটি সরলরেখার চলন দিয়ে বুঝতে গেলে ভ্রমের সম্ভাবনাই অধিক। বরং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রশ্নে পার্টির নির্ধারক ভূমিকা এখানে আগেই দেখানো হয়েছে। তাছাড়া সকলেই তেভাগা, তেলেঙ্গানার কিংবদন্তি লড়াইগুলি সম্পর্কেও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ফলে সেই প্রসঙ্গ বাদ রাখাই শ্রেয়। কিন্তু সমস্যার কেন্দ্র নিহিত থাকে গভীরে। পার্টির মধ্যে পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব বৃদ্ধি ক্ষতিকর কারণ তা শ্রমিকদের সংগঠন এবং সংগ্রামের জন্য তাদের নেতৃত্বদায়ী ভূমিকাকে পিছনে ঠেলতে থাকে। শ্রমিকরা পার্টির নীতি নির্ধারন করা, শিক্ষিত হয়ে ওঠার গুরু দায়িত্ব অবহেলা করতে থাকে। একটা চিঠি লিখতেও তাদের হাত কাঁপতে থাকে। ভীষন ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকে শিক্ষিত কমরেডদের উপর। ফলে পার্টিতে শ্রমিক শ্রেণি ৬০ বা ৯০ শতাংশ এটা প্রশ্ন তো বটেই কিন্তু মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন দাঁড়ায় পার্টিতে সমাবেশিত শ্রমিকরা কি শিক্ষিত হয়ে উঠছে, তারা কি নিজেরা শ্রেনি সচেতন হয়ে উঠছে, তারা কি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশ্নগুলির মধ্যে প্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে? এর উত্তরের ভার নেতির দিকে হেলে থাকলে সেই পার্টি কোনও ভাবেই শ্রেণি পার্টি হয়ে উঠবে না যত বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামেই সে অবতীর্ণ হোক না কেন। খুব স্পষ্ট করেই বলা প্রয়োজন কলে কারখানার লড়াই হোক বা সংসদের নির্বাচন এই Vanguardism উপনিবেশের সংখ্যাগুরু কমিউনিস্ট পার্টির চরিত্রের অন্তর্গত উপাদান হিসেবে ক্রিয়াশীল থেকেছে।
বুর্জোয়া ব্যবস্থা ধ্বংস এবং সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের রাস্তা বহুমুখি। নানা রাস্তায় অবধারিত ভাবে বিপথু হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই। এমনই এক বড় বিপদ হল নির্বাচন। সর্বজনীন নির্বাচন ব্যবস্থার প্রচলন জনপ্রিয়তা অর্জনকারি পার্টিকেও সেই দিকে ঠেলতে থাকে। ক্রমাগত নির্বাচনে অংশগ্রহন করার তাগিদ এক অভ্যাসে পরিণত হয়। পার্টি ভুলে যায় অমোঘ সত্য, এই ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি নেই। মুক্তি আছে এই ব্যবস্থার ধ্বংসের মধ্যে। পৃথিবীর বহু পরীক্ষিত পার্টি এই গাড্ডায় পড়ে শ্রমজীবি মানুষের লড়াই, আন্দোলন এবং অগ্রগতিকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহন এবং তার সাফল্য পার্টিগুলিকে সরকারে আসীন করে। তখন তার প্রধান লক্ষ্য দাঁড়ায় যে কোনও উপায়ে ক্ষমতায় টিঁকে থাকা। সরকারে থাকার সুবাদে সে কিছু অনুদান, সংস্কার করে শ্রমজীবী মানুষের বোঝা লাঘব করে। দরিদ্র মানুষ ক্রমে নিজস্ব সংগঠন, লড়াইয়ের রাস্তা ভুলে পার্টির স্বার্থকে নিজের স্বার্থ হিসেবে দেখতে থাকে। মর্চে পড়তে থাকে শ্রেণির চেতনা, শ্রেণির সংগ্রামে। বুর্জোয়া ব্যবস্থার অঙ্গীভূত হতে হতে এক সময়ে সেই পার্টি সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে বাধ্য হয় শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার। এই ঘটনা অনিবার্য আর এই ঘটনাই দেশে দেশে ছত্রাকের মত ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্নটা নির্বাচনে সাদামাটা অংশগ্রহনের নয়, শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিকোন থেকে প্রশ্ন হল – কেন নির্বাচনে অংশগ্রহন করব, কোন লক্ষ্যে করব, সেই সময়ের শ্রেণি সংগ্রামের স্তর তা দাবি করছে কি না, নির্বাচনে অংশগ্রহন করার মধ্যে দিয়ে শ্রেণি সংগ্রাম বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে কি না ইত্যাদি প্রশ্ন হওয়া উচিত ভরকেন্দ্র। শুধু নির্বাচন নয়, যে কোনও সংগ্রামে অংশগ্রহনের প্রশ্নকে উলটে পালটে শ্রেণি স্বার্থের আতশকাঁচ দিয়ে দেখার ক্ষমতা পার্টিকে শ্রমিকদের শ্রেণি পার্টি হয়ে ওঠার পরিচয়ের সূচক।
পার্টিগুলির এ হেন পদস্খলন কিন্তু শ্রমিক শ্রেণি তথা মেহনতি মানুষ রোধ করতে সক্ষম হয় নি। হওয়া অসম্ভব ছিল কারণ Vanguard পার্টির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল না শ্রমিক শ্রেণির পার্টি হয়ে ওঠা। এই সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন তাতে সন্দেহ নেই কিন্তু গত দেড়শো বছরের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরাজয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষা হিসেবে এই সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। একাধারে vanguard পার্টির চরিত্র এবং তার ফলশ্রুতিতে পার্টিতে পেটি বুর্জোয়াদের নেতৃত্ব শ্রমিক শ্রেণিকে তার প্রকৃত সত্ত্বায় উন্নীত হওয়ার পথে বাঁধা সৃষ্টি করেছে। এক সময়ে এসে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন এবং ক্ষমতা অধিকার হয়ে গেছে মূল লক্ষ্য। অন্যান্য বুর্জোয়া পার্টিদের সঙ্গে মুছে গেছে বিভেদরেখা। ফলত শ্রমিক শ্রেণি জলে পড়ে গেছে। হয়ে গেছে ছত্রভঙ্গ। তাই ১২/১৪ ঘন্টার দাসত্বের ইতিহাস আবার সজীব হয়ে উঠেছে।
গত ৫০ বছরে শ্রমিক শ্রেণির তরলায়িত হওয়ার ইতিহাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, উপনিবেশের দেশগুলিতে কমিউনিস্ট পার্টির উদ্ভব ও বিকাশ, সোভিয়েত দেশের বিজয়, চীন বিপ্লবের সাফল্য – সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবে পুঁজিবাদকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। ১৯৪৫-১৯৮০ এই কালখন্ডে বিশ্বজুড়ে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, শ্রমিক শ্রেণি সহ মেহনতি মানুষের অগ্রগতি, কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবের বৃদ্ধি নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, যদিও তা সমস্যা রহিত ছিল না। এই ঐতিহাসিক স্রোত বিশ্ব পুঁজিবাদকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। বহুবিধ আর্থিক সূচকের মধ্যে দিয়েও তার প্রকাশ ঘটে। এই সময়ে বিশ্বে শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত মজুরি বেড়েছে উৎপাদনশীলতা বাড়ার পরও। উক্ত পর্বে পুঁজির লাভে হার ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে আসে। সরকারি নীতিগুলি শ্রমের দিকে হেলতে থাকে। কোম্পানি ট্যাক্স বাড়তে থাকে, সামাজিক কল্যানে সরকারি খরচ বাড়তে থাকে, শ্রমের বাজারে স্থায়ী কাজের নীতি লাগু হতে থাকে। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশগুলিতেও পুঁজির উপর লাগাম চাপানো হয়। বুনিয়াদি শিল্প ক্ষেত্রে খোলা বাজারের পরিবর্তে সরকারি হস্তক্ষেপ ছিল চালু বিধি। বড় ও সংগঠিত শিল্পে স্থায়ী কাজের শর্ত চালু হয়। ১৯৪৬-৪৮ পর্বে দেশে একের পর এক শ্রম আইন চালু হতে থাকে। Industrial Dispute Act, Minimum Wages Act, Factories Act এবং ৮ ঘন্টা শ্রম দিবসের আইনও ছিল তার অঙ্গীভূত। অর্থাৎ শ্রমের বাজারকে সুরক্ষিত রাখার প্রচেষ্টা ছিল। তাছাড়া দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষিত রাখার নীতি গৃহীত হয়েছিল। কিছু কিছু পণ্যের উপর আমদানি কর ছিল ৩০০%। সামগ্রিক ভাবে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি সহ দেশীয় পুঁজির উপর একটা পরিমানে নিয়ন্ত্রন কায়েম ছিল। শ্রম আইনগুলি কেবল খাতায় বন্দি ছিল না। এর মূল কারণ নিহিত ছিল শ্রেণি সংগ্রামের মধ্যে। সদ্য স্বাধীন দেশের বুর্জোয়া নেতাদের পক্ষে শ্রমজীবী জনতার লড়াকু মেজাজকে অস্বীকার করা সহজ ছিল না। স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্বে ভারতীয় শ্রমিক কৃষকদের সংগ্রাম বুর্জোয়াদের লাগামছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার পথে ছিল প্রতিবন্ধক। সংগঠিত ইউনিয়নগুলি একটা মাত্রায় জীবন্ত ছিল। তদুপরি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপও ছিল যথেষ্ট।
এই চিত্রটি ৮০-র দশক থেকে বদলাতে থাকে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারে আসীন হওয়ার পর। পার্টির কেন্দ্রীয় স্লোগান “বামফ্রন্ট সরকারকে চোখের মনির মত রক্ষা করতে হবে” অন্য সব জরুরি বিষয়কে ধামাচাপা দিতে থাকে। মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্বকে প্রশমিত করতে থাকে আপোষ মীমাংসার পরিসরে এবং ক্রমশ স্থিতাবস্থা বজায় রাখার খাতিরে মালিক শ্রেণির পক্ষে অবস্থান গ্রহন করতে থাকে। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন হতে থাকে অবহেলিত। দীর্ঘদিন ইউনিয়ন সহ পার্টির উপর নির্ভরশীলতা শ্রমিকদের পায়ের তলার মাটি কেঁড়ে নেয়। শ্রমিক শ্রেণির পিছু হটা চলতেই থাকে। বলা ভাল শ্রেণি পরিচয় হারিয়ে তারা একেবারে বিদ্ধস্ত হয়ে যায়।
দ্বিতীয় বুর্জোয়া বিপ্লব
গোটা বিশ্বে লাভের হারের পতন পুঁজিপতি শ্রেণিকে পাগল করে দেয়। ১৯৮০-র দশক থেকে তারা পাল্টা আক্রমনে যেতে থাকে। উদারিকৃত বিশ্বায়নের স্লোগানকে প্রথমে এক সামাজিক আদর্শ হিসেবে স্থাপন করে, পরবর্তীতে আর্থিক ও রাজনৈতিক জগতে অতি দ্রুততার সঙ্গে পটের পরিবর্তন করতে থাকে। মুক্ত বাজার, সকলের জন্য প্রচুর পছন্দের সুযোগ (জীবিকা ও ভোগের), বিশ্বময় পুঁজি লগ্নির স্বাধীনতা, অপদার্থ সরকারি দপ্তর তুলে দেওয়ার জোরাল দাবি – এই রকম বিবিধ ও অত্যন্ত জরুরি নীতিগুলি যেন স্লোগানের গুচ্ছে পরিণত হয়। প্রচারের জোরাল হাওয়া সামাজিক পরিসর সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানে তীব্র প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হতে থাকে। ৯০-র দশকে দরজা খুলে দেওয়ার পর থেকে শ্রমিক শ্রেণির উপর নেমে আসতে থাকে মারাত্মক আঘাত। অনেকেরই মনে থাকার কথা ২০১১-১২ সালে মানেসরে মারুতি কারখানায় ঠিকা শ্রমিকদের স্থায়ী করার আন্দোলনে বড় রকমের সংঘর্ষ হয়। শীর্ষ আদালত বেশ কিছু শ্রমিককে যাবজ্জীপন দন্ড দিয়ে বলেছিল, “শ্রমিকদের এই রকম উচ্ছৃঙ্খল আন্দোলন লগ্নির বাজারে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে ফলে আদালত নিদর্শন মূলক শাস্তি দিতে বাধ্য”। ২০২৬-র ফেব্রুয়ারি মাসে গৃহপরিচারিকাদের ন্যূনতম বেতনের শুনানি নাকচ করে আদালত আবারও বলে, “গৃহপরিচারিকারা যে পরিবারে কাজে লিপ্ত হয় সেখানে তারা পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠে, ফলে পরিবারের অভ্যন্তরীন বিষয়ে আদালত হস্তক্ষেপ করতে রাজি নয়”। তাছাড়া অযাচিত ভাবে বলে, ”দেশে অতিরিক্ত ইউনিয়ন কাজের ও লগ্নির পরিবেশের ক্ষতি করছে”। অর্থাৎ এই উদারবাদী দর্শন ও নীতি উৎপাদনের চৌহদ্দি অতিক্রম করে দেশের সরকার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্ব ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। ৯০ দশকের শেষ থেকে দেশে শুরু হয় Business Summit। এক কথায় লগ্নি টানার উদ্দেশ্যে বেসরকারি পুঁজির কাছে জাতীয় স্বার্থকে বিকিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা। ব্যতিক্রমহীন ভাবে প্রতিটি রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকার জমি, জল, বিদ্যৎ সহজ শর্তে দেশি বিদেশি বেসরকারি পুঁজির পায়ে নিবেদন করতে থাকে। এই সামাজিক আবহাওয়ায় মনে হতে থাকে এরাই হল মাই-বাপ। বিস্তারে না গিয়েও সামান্য কিছু সূচকের উল্লেখ শ্রেণি রাজনীতি বোঝার স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি।
ক) দেশে স্বাধীনতার সময়ে উপরের ১০% মানুষের হাতে ছিল ৫০ শতাংশ সম্পদ যা ১৯৮০-তে নেমে যায় ৩০ শতাংশে কিন্তু উলটো যাত্রায় বর্তমানে তা ৭০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলেছে।
খ) আমেরিকায় ১৯৭০ থেকে ২০২৫ অবধি শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি থমকে আছে ১৬ ডলারে(৬)।
গ) ১৯৯৬-র হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের ৩৫৮ জন সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তিদের সম্পদের পরিমান ছিল তলাকার ২৩০ কোটি (বিশ্ব জনসংখ্যার ৪৫%) মানুষের সম্পদের সমান(৭)।
এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যা বুঝতে সাহায্য করে কেবল আমাদের দেশেই নয় বরং গোটা বিশ্বে পুঁজিবাদী শ্রেণি তীব্র মাত্রায় প্রত্যাঘাত করতে সমর্থ হয়েছে। বস্তুত এই মাত্রায় সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটেছে ১০০ বছর পর। যে সব ক্ষেত্র এই কালপর্বের আগে ছিল সরকারের হাতে যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য তাও ধীরে ধীরে চলে গেছে পুঁজিবাদীদের করাল গ্রাসে। ফলে আঙ্কিক হিসেবেই একে পুঁজিবাদের দ্বিতীয় বিপ্লব বলা অসমীচীন নয়। কোনও বিপ্লবই হুট করে সংগঠিত হতে পারে না, তা রক্তপাত যুক্ত/হীন যাই হোক না কেন। একটি ব্যাপ্ত, শৃঙ্খলিত আর্থিক ব্যবস্থা কেবল কিছু অর্থের লগ্নি, উৎপাদন এবং বিক্রির উপরেই নির্ভরশীল নয়। দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়া তার পক্ষে সমাজে প্রবল ভূমিকা রাখা অসম্ভব। যেমন উৎপাদক পুঁজির চাহিদা থাকে সুদের হার কমিয়ে রাখা, শ্রমের বাজারে আইন কানুন শিথিল রাখা বা প্রণয়ন করা থেকে বিরত থাকা। এই সিদ্ধান্তগুলি তার নিয়ন্ত্রনাধীন নয় ফলে এই সংক্রান্ত নীতিগুলি তার পক্ষে কার্যকরি করার স্বার্থে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রভাবিত করা একান্তই জরুরি হয়ে পড়ে। সঞ্চয়, সুদ, লাভের হার শ্রমের বাজারের তরলীকরণ নীতগুলি রুপায়িত হতে গেলে প্রয়োজন আদর্শনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভাব। খুব সংক্ষেপে সেদিকে নজর ফেরান যাক। A Brief History of Neoliberalism গ্রন্থে ডেভিড হার্ভে লিখছেন, “মার্কিন উকিল এবং প্রাক্তন সেনা, একটি গোপন চিঠিতে মার্কিন চেম্বার অফ কমার্সকে লিখছেন, বেসরকারি পুঁজির সমালোচনা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। আমাদের কর্তব্য তার পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করে এর বিরুদ্ধ শক্তিকে পরাস্ত করা। চেম্বারের উচিত প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া, আদালতের বিরুদ্ধে এবং বেসরকারি পুঁজির পক্ষে তীব্র ও লাগাতার আক্রমন শানানো। আক্রমনের লক্ষ্য থাকবে সামাজিক মূল্যবোধের জগতে পরিবর্তন ঘটানো। স্বাধীনতা, আইন, সাংস্কৃতিক চেতনা বেসরকারি পুঁজির হাত ধরে উন্নয়ন সম্পর্কে মানুষের ধারনার মৌলিক পরিবর্তনের প্রচেষ্টা করবে। অনতিবিলম্বে চেম্বার ২.৫ লাখ বেসরকারি সংস্থাকে একত্রিত করে বিপুল সম্পদ সহ তীব্র প্রচার সংগঠিত করে। ১৯৭২ থকে প্রতি বছর প্রায় ৯০০ লাখ মার্কিন ডলার ঢালতে থাকে প্রচারে। পরোক্ষে আর্থিক নীতির চিন্তা উদ্রেককারি প্রতিষ্ঠাগুলিতে যেমন Hoover Institute, Heritage Foundation, National Bureau of Economic Research বিপুল অর্থ লগ্নি করা হতে থাকে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের পিছনেও ঢালা হয় প্রচুর অর্থ। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শুরু হয় পুঁজির গুনগান, পরিবর্তিত হয় পাঠ্যক্রম। নতুন প্রজন্মের চিন্তাকে বাঁধা হতে থাকে পুঁজির রশিতে। পত্রপত্রিকা, টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে সমাজ মননে গাঁথা হতে থাকে উন্নয়নের একমাত্রিক ভাষ্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ Milton Friedman-র গ্রন্থ ‘Free to Choose’-কে কেন্দ্র করে নির্মিত হয় টিভি সিরিয়াল। এই ঘটনা পুঁজিবাদের প্রচারের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। খেয়াল রাখা জরুরি ১৯৮৬-তে Friedman নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। উৎসাহী পাঠকরা ডেভিড হার্ভের এই বইটির দারস্থ হতে পারেন। এই চিন্তা, প্রচার ও নীতির স্রোত ছড়ানো হতে থাকে গোটা বিশ্ব জুড়ে। যার প্রকাশ দেখা যাবে ৮০-র দশক থেকে ল্যাটিন আমেরিকায় উদারবাদী অর্থনীতির প্রয়োগ এবং চীন সহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ৯০ পরবর্তী সময়ে তার প্রসার।
গোটা উদারবাদী-বিশ্বায়নের প্রকল্পের শিকড়ে ছিল ‘মুক্ত বাজার’ নীতির প্রয়োগ। অর্থাৎ সরকারের কোনও ভাবেই পুঁজি ও শ্রমের বাজারকে নিয়ন্ত্রন করা উচিত নয়। কোনও আইন কানুন দিয়ে শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা আসলে আর্থিক উন্নতির পরিপন্থী – এই ধারনাকে প্রোথিত করা এবং সেই প্রকল্পকে অত্যন্ত সফল ভাবে গোটা বিশ্বে তারা প্রয়োগ করতে সমর্থ হয়েছে। শ্রম আইন লঘু করা, পুঁজির লাভের উপর ক্রমহ্রাসমান কর ইত্যাদি প্রসঙ্গ সরিয়ে রেখেও দেখা যাক এই ‘মুক্ত বাজারের’ চরিত্র। ২০০৭-০৮-এ উন্নত পুঁজিবাদী দেশের ব্যাঙ্কগুলি প্রবল সংকটে পড়ে যায়। ব্যবসার লগ্নিতে টান পড়ায় তারা সরকারের দারস্থ হয়। শুধুমাত্র আমেরিকাতেই সরকার ৭০০ বিলিয়ন ডলার উপহার দেয়(৮)। অন্যান্য দেশের প্রসঙ্গে আর ঢুকলাম না। আমাদের দেশে গত ১০ বছরে সরকার ১০ লক্ষ্য কোটি টাকা কর্পোরেটদের ঋণ মকুব করে দিয়েছে(৯)। ‘মুক্ত বাজারের’ অনুপম নমুনাই বটে!
ভিসুভিয়াসের পুনর্জাগরণ ২০২৬ – সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত!
২০২৬-র জানুয়ারি মাসে পানিপথে ইন্ডিয়াল অয়েল কর্পোরেশনের শোধনাগারে সূচিত হয় শ্রমিকদের প্রথম বিস্ফোরণ। গত তিন মাসাধিক কাল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে। এই লেখার সময়েও উত্তরাখন্ড, পাঞ্জাব, রাজস্থানের নতুন নতুন কারখানায় শ্রমিক আন্দোলনের খবর আসছে। শ্রম বিষয়ে ওয়াকিবহাল মহলে জানুয়ারি মাস থেকেই খবর পৌঁছে গেছিল। কিন্তু গোটা দেশের নজরে এল নয়ডার শ্রমিকদের বিক্ষোভ, আন্দোলনের পর মধ্য এপ্রিলে। গত তিন মাসে সমাজ মাধ্যমের বেশ কিছু প্ল্যাটফর্মে, নিউজ পোর্টালে খবর ও বিশ্লেষন উঠে এসেছে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের চর্চা, লেখালেখি অবশ্যই অভিনন্দন যোগ্য। এই সীমিত চর্চার বাধ ভেঙ্গে যায় নয়ডার শ্রমিকদের আন্দোলনের পর। বানিজ্যিক সংবাদপত্র, টেলিভিশনে উঠে আসতে থাকে শ্রমিকদের বিস্ফোরণের খবর। সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের শ্রমিক বিরোধী ভূমিকাও সামনে আসতে থাকে। ইত্যাবধি বহু শব্দ, ভিডিও, স্থিরচিত্র আমাদের অবহিত করেছে আন্দোলনের নিহিত কারণ, তার ফেটে পড়া, বিস্তার এবং সরকারের জঘন্য ভূমিকার বিষয়ে। ফলে এর বিস্তারিত প্রসঙ্গে প্রবেশ অপ্রয়োজনীয়। যে প্রশ্নটা খোঁজা জরুরি – এই বিক্ষোভ কি একেবারে অপ্রত্যাশিত।
সমাজ মাধ্যমে বেশ কিছু প্ল্যাটফর্ম চিন্তাশীল মহলে বেশ জনপ্রিয়। মূলত বাম-প্রগতিশীল মহলই তার উপভোক্তা। সেখানেও পড়া গেল এই আন্দোলগুলি ছিল একেবারে অপ্রত্যাশিত, এমন ভাষ্য। এমনকি বেশ কিছু বিপ্লবী গ্রুপের আলোচনা, লেখালেখিতেও এই ‘অ-প্রত্যাশা’ ধ্বনিত হয়েছে, সচেতন বা অসচেতন ভাবে। নামীদামি বাজারি কাগজের কথা উহ্য রাখাই বাঞ্ছনীয়। তবে এই প্রশ্নে প্রবেশের আগে মুক্ত কন্ঠে সেলাম জানানো আবশ্যক সেই সব লাখ লাখ শ্রমিক ভাইবোনেদের যারা শুয়োপোকা-গুটির অভ্যন্তর থেকে ছড়িয়ে পড়েছে রঙিন প্রজাপতি হয়ে, ক্লেদাক্ত ও আশাহীন জীবনে দিয়েছে এক আলোর ঝাপটা।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। নির্দ্বিধায় বলা যাক – নাহ, এই বিস্ফোরণ কোনও ভাবেই অপ্রত্যাশিত নয়। পাঠকের পক্ষে ভাবা স্বাভাবিক যে ফিরে দেখার পন্ডিতি ছাড়া এর মধ্যে নেই কোনও সার বস্তু। এর উত্তরে বলা দরকার এই আকালেও এই মর্মে চর্চা ও অনুশীলন দুর্লভ হলেও একেবারে অনুপস্থিত নয়। জনপ্রিয় বাম মহল একে অপ্রত্যাশিত ভেবেছে কেন, তার কারণ উপরেই চর্চিত হয়েছে। এই দেশের বিস্তৃত বাম ও বিপ্লবী চেতনার গভীরে বাস করে সেই Vanguardism। এদিকে কোনও পার্টি নেই, কোনও বিপ্লবী গ্রুপেরও দেশজোড়া প্রভাব পরিলক্ষিত নয় – তারপরও এমন ঘটনা, ফলে প্রায় সকলেই খানিকটা হতচকিত হয়ে গেছে। শ্রমিকরা যে নিজেরাই এ হেন বোমা ফাটাতে পারে এ যেন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা! এর প্রভাব প্রায় প্রতিটি আলোচনাতেই প্রকট না হলেও প্রচ্ছন্ন ভাবে উঠে এসেছে।
পাঠকের কাছে অনুরোধ এই লেখার প্রথমাংশে ফিরে যাওয়ার। Engels বর্ণিত Condition of Working Ckass in England এই দেশে আজও শ্রমিকদের দেহে, মনে, বাসস্থানে উঁকি মারলেই জীবন্ত ধরা দেবে। টাইম মেশিনে চড়ে সাগর পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আজও প্রতিটি শ্রমিক বস্তিতে গেলে দেখা যাবে ৬’x৮’ ঘরের মধ্যে চলছে রান্না, খাওয়া, বিশ্রাম, আড্ডা, লেখাপড়া। ঘরে আসবাব মানে সাকুল্যে একটি চৌকি, তার উপরে ও নীচে চলেছে সমান্তরাল সংসার। স্যাঁতস্যেতে ঘরে এক চিলতে জানালা, বৃষ্টিতে নিরবচ্ছিন্ন জলের সাপ্লাই, সদা বিদ্যমান ঘ্যানঘ্যানে, আলো বাতাসের প্রবেশ নিষিদ্ধ। Marx বলছেন, “Windows are to the room what senses are to the human mind”। খাওয়ার মেনুতে ভাত/রুটি সঙ্গে একটি মাত্র তরকারি/ডিমের কারি। উপায় নেই, ৩০ দিন ১২ ঘন্টা কোমর ভাঙ্গা খাটনির পর মাইন ১১/১২ হাজার।
ফলত আন্দোলন ছিল অনিবার্য। স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভই ছিল নিয়তি। কোনও পার্টি/সংগঠন/ইউনিয়নের অনুপস্থিতিতে আন্দোলনের মুখ্য চরিত্র এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক। প্রতিবাদ/প্রতিরোধহীন শোষনে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের পক্ষে কোনও না কোনও সময়ে প্রত্যাঘাত করাই ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। একেবারে নিজেদের উদ্যোগে-ই প্রতিরোধ গড়ে তোলাটাই ছিল স্বাভাবিক। উনিশ শতকের প্রথমার্ধের ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। তাছাড়া ইতিহাস সরিয়ে রাখলেও বোঝা উচিত যে পুঁজির যেমন শোষন করাটাই ধর্ম তেমনি একটা পর্যায়ের পর শ্রমিকদের ধর্মও নিয়তি নির্দিষ্ট – পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রাম। নিজস্ব জানপ্রাণ বাঁচানোর সংগ্রাম। সে প্রতিরোধ কখন হবে তা বলা অসম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জ্বালানির মাত্রাধিক মূল্যবৃদ্ধি সম্ভবত ঘৃতাহুতির কাজ করেছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই, এটি মূল কারণ নয়। তাছাড়া যুদ্ধ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অচ্ছেদ্য অঙ্গ ফলে তাকে বহিঃস্থ বলে মনে করা খুব বিবেচনা সম্পন্ন হবে কি। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বহু তৎকালীন সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছিল।
আন্দোলনের দাবিগুলি সকলেই জানি তবু উল্লেখ করা জরুরি। মজুরি বৃদ্ধি, ডাবল রেটে ওভারটাইম, সাপ্তাহান্তিক ছুটি এবং ১২ নয়, ৮ ঘন্টা কাজ। এর মধ্যে সর্বাধিক জরুরি দাবি নিঃসন্দেহে – মজুরি বৃদ্ধি এবং ৮ ঘন্টা কাজের দাবি। দুই শতক পার হয়ে এই দাবিগুলি একেবারে সামনে উপস্থিত হয়ে কী প্রমান করছে। প্রমান করছে বর্তমানে কমিউনিস্ট আন্দোলন বা শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি একেবারে তলানিতে। ছোটবড় বিপ্লবী গ্রুপ, বামমনস্ক মানুষরা সম্ভবত বুঝতে পারছে পরিস্থিতি কতোটা শোচনীয়।
বেশ কিছু চর্চায় প্রশ্ন উঠেছে, জোরদার শ্রমিক আন্দোলনের পরের ভবিষৎ কী। এখুনি কোনও সিদ্ধান্তে আসা সমীচীন নয়। সবে শ্রমিকরা ঘুম ভেঙ্গে উঠে একটা প্রাথমিক ঝটকা দিয়েছে। সেই ঝটকার কিছু তাৎপর্য দেখা যেতে পারে।
১) পুঁজিপতি শ্রেণি সহ সরকারগুলির কাছে স্পষ্ট বার্তা গেছে। মানেসর, নয়ডা সহ অন্যান্য কারখানাতেও আংশিক দাবি আদায় হওয়া এই কথা প্রমান করছে।
২) হতাশাগ্রস্ত শ্রমিকরা দীর্ঘদিন পর বুঝল একমাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই তাদের জীবন, জীবিকা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। এই আন্দোলনে এখন অবধি আনুমানিক ২.৫-৩.০ লাখ শ্রমিক অংশগ্রহন করেছে। কিছু দাবি আদায়ের পর তারা কাজে ফিরে গেছে। লক্ষনীয় আন্দোলনের স্রোত স্তব্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন ক্ষেত্রে। অর্থাৎ শ্রমিকরা আগে শুরু হওয়া আন্দোলন থেকে প্রেরণা পাচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা জনিত শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আন্দলনের দাবিগুলির সম-চরিত্র থেকে একটি কারখানার বা একটি অঞ্চলের শ্রমিকরা বুঝতে পারছে তারাই কেবল এই তীব্র শোষনের স্বীকার নয় দেশজোড়া শ্রমিকরাই এর স্বীকার।
৩) শ্রমিকরা অর্থনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মৌলবাদী ও ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকারের প্রকৃত চরিত্র সম্বন্ধে অবহিত হল। বেশ কিছু ভিডিওতে শ্রমিকদের বলতে শোনা গেল, “আমরা এতোদিন বিজেপিকেই ত্রাতা হিসেবে ভোট দিয়ে এসেছি, আজ বুঝতে পারলাম তারা আমাদের বোকা বানিয়েছে”। বিজেপির চরিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। সামান্য সময়ের আন্দোলন-ই রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি করেছে। খেয়াল রাখা দরকার এই বোধ আন্দোলনকারি শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা অসম্ভব। মূলত বিহার, উত্তরপ্রদেশের গ্রামের শ্রমিকরাই ছিল এর মেরুদন্ড। তাদের রাজনৈতিক বোধ যাকে বলা হয় ‘হিন্দু হার্টল্যান্ড’-এ অবশ্যই ছড়িয়ে পড়বে, এর সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারি। দ্বন্দ্ব-সংঘাত ব্যতিরেকে এই রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার সম্ভব হতো কি।
৪) আংশিক দাবি আদায়ের পর শ্রমিকরা ফিরে যাবে, কিছুদিন পর আন্দোলনে ভাটা আসবে, সেটাই স্বভাবিক। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও কিছু সচেতন শ্রমিক অবশ্যই বুঝবে এই একটি লড়াই আসলে উৎসমুখ। নিরন্তর প্রবাহের জন্য জরুরি সংগঠন। বিভিন্ন স্থানের আন্দোলনকারিদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা শুরু হবে এটুকু আশা করা অযৌক্তিক হবে না। এই রাস্তায় দেশজোড়া শ্রমিকদের একটি সংগঠন গড়ে ওঠা মোটেই অসম্ভব নয়। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিতে তরুণ শ্রমিকরা বেশ সিদ্ধহস্ত। তাছাড়া যে সংগঠনগুলি শ্রমিকদের মধ্যে পড়ে থেকে কাজ করছে তারাও এই বিষয়ে ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে এই ধরণের কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে যা অবশ্যই আশাব্যাঞ্জক।
সূত্র –
১) Condition of Working Class in England – Friedrich Engels, Panther edition 1969, pg 154
২) 8 hour workday – National Museum Australia
৩) Convention No 1: A Landmark for Workers Right ILO
৪) Rise of Working Classes: Trade Unions and Socialism 1871 – 1914 JSTOR
৫) Historical Background of Trade Union movement in India – JSTOR
৬) A Brief History of Neoliberalism: David Harvey, pg 25
৭) A Brief History of Neoliberalism: David Harvey, pg 34
৮) Emergency Economic Stabilasation Act 2008 Wikipedia
৯) Centre wrote off 9.87 Lac Crore Corporate Loan: Indian Express Feb 5, 2026
লেখক শ্রমিক আন্দোলনের কর্মী।

