ডিলিটেড ভোটারের চোখে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৬


  • April 13, 2026
  • (0 Comments)
  • 170 Views

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে অবৈধ বলছেন নাম বাদ যাওয়া ভোটারেরা

 

 

সুদর্শনা চক্রবর্তীর প্রতিবেদন

 

সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থান, শহর-গ্রাম-মফস্বল, জাতি-বর্ণ-ধর্ম, লিঙ্গ পরিচিতি সব পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের এক বিশাল অংশ আজ ডিলিটেড ভোটার। তাঁদের চোখে এই নির্বাচন ঠিক কেমন? 

 

সাহেব আলম, বন্ধ জুট্মিল কারখানার প্রাক্তন কর্মী, বর্তমানে এক আবাসনের নিরাপত্তাকর্মী

 

 

“আমার নাম কাটা যাওয়ার কারণ তো কিছুই বলা হচ্ছে না। বিএলও তো এখানে আসছেনও না, যে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করব। এবার এরজন্য যে লড়াই-ই হবে, আমাকে তো তাতে এগিয়ে গিয়ে লড়তে হবে। আমার তো সব কিছুই এখানে। আর আমার নাম বিনা যুক্তিতে, বিনা কারণে কাটা হয়েছে। তাই এই লড়াইতে সব মানুষ যদি একসঙ্গে এগিয়ে যান, আমিও তাঁদেরই সঙ্গে হাঁটব।

 

আমার নাম কেন কাটা গেল? বিএলও এক সপ্তাহ আগে আমাকে আবার ডেকে পাঠিয়েছিল। উনি বললেন সব ওকে আছে। আমি আমার কারখানার (বর্তমানে বন্ধ এনজিএনসি ন্যাশনাল জুট মিল কারখানা) এস আই কার্ডের জেরক্স নিয়ে গেলাম। পেনশন -এর জেরক্স নিয়ে গেলাম। উনি বললেন, না, না এসব লাগবে না। তোমার সব ঠিক আছে। আমি আশ্বস্ত হয়ে গেলাম যে আমার নাম এবার কাটবে না। কিন্তু যখন আবার লিস্ট এলো, তখন দেখলাম যে আমার নাম কাটা গেছে। আমার জামাইয়ের নামও কাটা গেছে। বাড়িতে বাকি সবার নাম আছে, আমার স্ত্রী, ছেলে, সবার। যেখানে যা যা বলা হয়েছে সব দিয়েছি, বলা হয়েছে সব ঠিক আছে, তারপরেও দেখছি নাম কাটা গেছে। কোথায় কী ভুল আছে, তাও যদি বলত, তাও তো চেষ্টা করে দেখতাম কিছু করার।

 

এটা লিগ্যাল নয়। এটা ইলিলিগ্যাল ইলেকশন হচ্ছে। যদি লিগ্যাল হত, তাহলে ২০০২-এ যাঁদের এখানে ভোট ছিল, তাঁদের নাম তো কাটা যেত না।”

 

ওয়াসিম ইসলাম, ফটোকপি-র দোকান আছে ও বাকি সময় অ্যাপ চালিত পরিবহনের চালক

 

লাস্ট ফাইনাল যে লিস্ট ২৮ তারিখে বেরোল, তাতে দেখি আমি ডিলিটেড। এর কারণ কি তা তো সরকার আমাকে বলবে! কোন কারণে আমার নাম কেটেছে? আমাদের চার জনই ডিলিটেড। এখনও পর্যন্ত যত জনের নাম বাদ দিয়েছে কারোর কোনোও কারণ বলতে পারছে না। কারণ বললে তবে তো সমাধান হবে। তবে তো আমরা কিছু করার কথা ভাবব।

 

আমার কাছে অনেক উপর তলা পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতা তো নেই। কিন্তু তাও যত দূর যেতে হয় যাব, যা করতে হয় করব। যতটা যেখানে লড়ার আছে, লড়তে হবে। নাগরিকত্ব বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা তো করতেই হবে। যতদূর সাহস আছে, যতটা ক্ষমতা আছে করতেই হবে।

 

আমি আগেই সব ডকুমেন্টস জমা করেছিলাম। আগে বলা হয়েছিল, যার কোনোও সমস্যা হবে, তার কাছে কাগজ আসবে। আমার কাছে কোনোও কাগজ আসেনি। একবার একটা ফোন এলো যে, আমার বাবার নামের সঙ্গে আমার নামের মিসম্যাচ আছে। তো আমি ফর্ম ফিল আপ করে, জমা দিয়ে দিলাম। তারপর সেরকম আর কিছুই আসেনি। তারপর যখন লিস্ট বেরোল, তখন আমার নাম আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন এলো। আমার, আমার দুই ভাই আর মাম্মি-রও এলো। আমার পরিবারে চার জনের। বলা হল আবার চার জন আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন-এরই ডকুমেন্টস দিতে হবে। আবার সব ডকুমেন্টস দিলাম। বলল, পাসপোর্ট দিতে হবে। তার আগে তো নর্মাল ডকুমেন্টস চলছিল, আমি আগে পাসপোর্ট দিইনি, তখন দিলাম। মাধ্যমিক, হায়ার সেকেন্ডারির সার্টিফিকেট দিলাম। প্যান কার্ড, ভোটার আই ডি কার্ড সব দিলাম।

 

বাস্তব হল, আমাদের (মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের) নামই বেশির ভাগ ডিলিট হয়েছে। আমার যে কলকাতার এন্টালিতে ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডে তিন পার্টে ৩৫০ জন ভোটার ডিলিটেড হয়েছেন। সব জেনুইন ভোট। ২০০২-এ যাঁরা ভোট দিয়েছেন, ডিলিটেড। যাঁর সব ডকুমেন্টস আছে, ডিলিটেড। যাঁর নেই, তার তো প্রব্লেমই প্রব্লেম। আগে তো কিছু লাগত না। ঘরে এসে নাম জিজ্ঞেস করত, ভোটার আই ডি হয়ে যেত। এখন কেন এটা করা হচ্ছে? যখন করা হচ্ছে, যার কাছে যা ডকুমেন্টস আছে, সব নিন তো আগে, তারপর কাজ করুন। প্রথমে ঠিক ভাবে বলে কয়ে ডকুমেন্টস নিচ্ছেন না, ঠিক করে চেক করছেন না, তাহলে ডিলিট করছেন কেন? যাঁর ডিলিট করছেন তাঁকে তো কারণটা বলুন।

 

আমার তো মনেই হচ্ছে না, এটা লিগ্যাল ইলেকশন হচ্ছে। আমি তো আগেও কতবার ভোট দিয়েছি। নির্বাচনের দু-তিন মাস আগে এসআইআর করা, এরকম কোথাও কখনোও হয়? এইটুকু সময়ের মধ্যে এত মানুষের ফর্ম চেক করা, ডকুমেন্টস চেক করা, কে করতে পারে! যদি করার হয়, এক বছর আগে থেকে করতে হত। পাঁচ বছর পর পর ভোট আসে। তাহলে এবার এরকম কেন করা হল?”

 

 

শামিম আখতার, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক থিওলজি, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

 

এবারে পশ্চিমবঙ্গের পুরো প্রসেসটাই ইললিগাল হচ্ছে। আমি জ্ঞানেশ কুমার সাহাবকে যেটা বলতে চাইছিলাম, আমরা তো শুনতে পাচ্ছি যে, আপনি সব নির্বাচনে ভোটিং সিস্টেমকে গন্ডগোল করে দেন, মেসিনের গন্ডগোল করে আপনি জিতে যান। জিততে হলে, আপনি এবারে এখানেও না হয়, তাই করতেন। ২৭ লক্ষ মানুষকে আপনি কেন এত বড় সমস্যায় ফেলে দিলেন? তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নিলেন? আপনাকে যদি করতেই হত, আপনি না হয় ইভিএম মেশিন হ্যাক করে দিতেন। আপনারা তো সব জায়গায় সেভাবেই জেতেন। এখানেও তাই করতেন, না হয়। ২৭ লাখ মানুষকে তো অন্তত বিরক্ত করতেন না।

 

আমাকে যে নোটিস পাঠানো হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, আমার বাবার নামের সঙ্গে অমিল আছে। আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না, যে, আমার মিসম্যাচ কী করে হচ্ছে। বিশ্বাস করুন, আমি ২০০৩ সাল থেকে বিহারে ভোট দিচ্ছি। তার আগের কথা আমি জানি না। বিহারে এসআইআর হয়েছিল কি না, তার খবরও আমার জানা নেই। কারণ আমি ইউ পি-তে, উত্তর প্রদেশে পড়াশোনা করছিলাম। হতে পারে, গ্রামে কেউ জানতে এসেছে যে মতিউর রহমান সাহাবের কত জন সন্তান আছে, তো কেউ হয়তো বলে দিয়েছেন – তিন জন – শামীম আখতার, নইম আখতার, নাসিম আখতার। সেটাই তারা লিখে নিয়ে চলে গেছেন। আমার ডকুমেন্টস চেক করেননি। অন্যদিকে ১৯৯৯ সালে আমার যে পাসপোর্ট তৈরি হয়েছে, সেখানে আমার পুরো নাম একদম ঠিক আছে। তারও আগে আমার ১৯৫৫ সালের যে বি এ ডিগ্রি আছে, সেখানেও আমার পুরো নাম ঠিক আছে। এসআইআর ছাড়া, আমার আর কোনো নথিপত্রে কোথাও কোনো ভুল নেই।

 

২০১২ সালে আমি আলিগড়ে ছিলাম। আমি উত্তর প্রদেশে ছিলাম। সেখান থেকে এখানে কর্মসূত্রে বদলি হয়ে চলে আসায় আমি আমার ভোটও পশ্চিমবঙ্গে ট্রান্সফার করে নিই। ২০১৬ সাল থেকে আমি এখানকার ভোটার হয়ে যাই।

 

এইখানেই আমার বক্তব্য হল, বিহার বা পশ্চিমবঙ্গ যেখানেই এসআইআর হোক না কেন, জ্ঞানেশ কুমার প্রেস কনফারেন্স-এ বলেছিলেন যাঁদের নাম ২০০২ বা ২০০৩-এর ভোটার লিস্ট-এ আছে, তাঁদের নামের বানান ভুল হোক বা ঠিক, যেভাবেই থাকুক, বাবার নামে বা মায়ের নামে বা তাঁর নিজের নামে – সেটাই যেন লেখা হয়, আপনাকে কোনোও ডকুমেন্টস দেখাতে হবে না, আমরা শুধু লিঙ্ক করব, কোনোও ডকুমেন্টস অ্যাটাচ করারও দরকার নেই। তো আমি এনুমারেশন ফর্মের সঙ্গে পার্ট নাম্বার দেখিয়ে দিলাম, আমি কোনোও সার্পোটিং ডকুমেন্টস দিইনি। সেটা জমাও হয়ে গেল। এবার সেটার ভিত্তিতেই আমার নাম কেটে দিয়েছে। মিসম্যাচ করে দিয়েছে।

 

জ্ঞানেশ কুমার যদি বলে দিতেন যে ভুল থাকলে মা, বাবার নামের সঙ্গে লিঙ্ক করে দিলে হবে, তাহলে আমার আম্মির নাম, যা ১০০% ঠিক আছে, তাহলে আম্মির নামের সঙ্গে লিঙ্ক করে দিতাম। আমি ফাঁসতাম না।

 

একই রকম ভাবে আমার ছেলের নামও বাদ দিয়েছে। তাঁর আম্মির নাম এখানকার ভোটার লিস্টে আছে। তাঁর নাম একদম ঠিক আছে। আমাদের ছেলের নাম, তাঁর নামের সঙ্গে লিঙ্ক করে দিতাম। আমার ছেলের বয়স মাত্র ২১ বছর। এমবিবিএস-এর ছাত্র। আমার চার ছেলে, তার মধ্যে ওই বড়। কলকাতায় আমার আর আমার বড় ছেলের নাম বাদ গেছে। বিহারে আমার পরিবারের আরোও যে পাঁচ জন আছেন, তাঁদের নাম আছে।

 

ট্রাইব্যুনালে আমি ইতিমধ্যেই আপিল করে দিয়েছি। অনলাইনে। আর অফলাইনের তো কী যে হাল কী বলব! যোসেফ বিল্ডিং-এ যখন জমা করতে গেলাম সেখানে তো নিচ্ছেই না। নিয়ে ফেলে দিচ্ছে সব। রিসিভ কপি দেওয়া তো দূরের কথা!

 

দেখুন, মুসলমানরা তো টার্গেট বটেই। মুসলমানরা তো আছেনই, কিন্তু অন্যরাও আছেন, আমাদের মুলক-এর বাসিন্দারা, পুরনো মানুষেরা সবাই এরমধ্যে পড়ে গেছেন। আমি যা বুঝছি, এখন আন্দোলন ছাড়া, অন্য কোনোও রাস্তা নেই। নিজেদের শক্তি দিয়েই এই সমস্যার সমাধান করা যাবে। জ্ঞানেশ কুমার শপথ করে বসে আছেন আমি কারোর সঙ্গে ইনসাফ করব না। রইল বাকি সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টই আমাদের বাঁচাতে পারে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের যা বক্তব্য তা আমাদের পক্ষে দেখা যাচ্ছে না।”

 

Share this
Leave a Comment