“হয় ভোটাধিকার নয় স্বেচ্ছামৃত্যু” – এস আই আর বিরোধী সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গের নাম বাদ যাওয়া নাগরিকের


  • April 9, 2026
  • (0 Comments)
  • 266 Views

“আমাকে সহ সেই সমস্ত মানুষকে ভোটাধিকার হয় ফিরিয়ে দিতে হবে, ভোট দেওয়ার অধিকার এই নির্বাচনেই দিতে হবে। আর তা না হলে আমি ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’র জন্য আপিল করছি, আমাকে সেই স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার, স্বেচ্ছামৃত্যুর অর্ডার মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম কোর্ট দিক।” – কলকাতা প্রেস ক্লাবে এসআইআর বিরোধী উদ্যোগ, যাদবপুর আয়োযিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে বললেন ফরিদুল ইসলাম।

 

সুদর্শন চক্রবর্তীর প্রতিবেদন

 

“আমি বেশ অনেক দিন ধরে ভাবনাচিন্তা করার পর, আমি নিজে দায়িত্বশীল ভাবে নিজে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি একটা প্রসেস শুরু করে দিয়েছি। সেই প্রসেসটা হচ্ছে – আমি মাননীয় রাষ্ট্রপতিকে একটা চিঠি করছি এবং আমাদের সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিদের যে ডিভিশন বেঞ্চ আছে সেখানে আপিল করছি, যেখানে আমি জানাচ্ছি যে, এই যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ডিলিট করা হয়েছে, তাঁদের ভোটাধিকার থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, আমাকে সহ সেই সমস্ত মানুষকে ভোটাধিকার হয় ফিরিয়ে দিতে হবে, ভোট দেওয়ার অধিকার এই নির্বাচনেই দিতে হবে। আর তা না হলে আমি ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’র জন্য আপিল করছি। আমাকে সেই স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার, স্বেচ্ছামৃত্যুর অর্ডার মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম কোর্ট দিক। আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় আমি এই বিষয়ে প্রচার শুরু করেছি। আমি আপনাদেরও জানালাম। এইখান থেকেই আন্দোলনটা গড়ে তুলতে চাই। তাতে যদি আমার মৃত্যুও হয়, সেই মৃত্যুতে যদি বিপ্লব আসে, সেই মৃত্যু বরণ করতে আমি রাজি আছি। এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, এই রাষ্ট্রের উলঙ্গপনা আমি গোটা বিশ্বের দরবারে, মানুষের দরবারে তুলে ধরতে চাই।”

 

এই বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্ব রক্ষার আন্দোলন ও এই মুহূর্তে এ রাজ্যের এসআইআর বিরোধী চলমান আন্দোলনে শরিক ফরিদুল ইসলাম-এর। ৮ অগাস্ট কলকাতা প্রেস ক্লাবে এসআইআর বিরোধী উদ্যোগ, যাদবপুর আয়োযিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত থেকে তিনি এই বক্তব্য রাখেন। ফরিদুল-এর বৃহত্তর পরিবারের মোট ৪৭ জন সদস্যের মধ্যে তিনি নিজে সহ ৭ জনের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তিনি দাবি করেন ভারতের নির্বাচন কমিশন বৈধভাবে অবৈধ কাজ অর্থাৎ এসআইআর চালিয়ে চলেছে। এর আগে সারা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি বিরোধী প্রতিবাদ আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন ফরিদুল। এবং তিনি জানান সেই সময়ের পর সাম্প্রতিক এসআইআর বিরোধী আন্দোলনেও পুলিশ-প্রশাসনের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। আন্দোলন থেকে সরে না আসলে ইউএপিএ-এর অধীনে গ্রেফতার হতে পারেন তিনি এমনও হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্টতই জানান ২০০৩ সালে ‘ঘুসপেটিয়া’ শব্দটি প্রথম শোনার পর, ২০১৯ সালেই বিজেপি-আরএসএস ষড়যন্ত্রে পাশ হয় সিএএ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও তা প্রতিরোধে যথেষ্ঠ সক্রিয় ভূমিকা নেননি। নাগরিকদের উপরে এভাবেই সব ক’টি রাজনৈতিক দল মিলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাতে শুরু করেন, তাঁদের ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে দিয়ে, বেনাগরিক করে দিয়ে। তার প্রতিরোধেই এমনকি নিজের জীবন স্বেচ্ছায় উৎসর্গ করে নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে চাইছেন ফরিদুল।

 

ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চের সদস্য সাজিদুর রহমান যেমন বলেন ৯১ লক্ষ মানুষকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন হচ্ছে তা বৈধ, গণতান্ত্রিক নির্বাচন নয়, “এই নির্বাচনকে আমরা মান্যতা দিচ্ছি না।“ তিনি দাবি তোলেন ২০২৫ সালের ভোটার তালিকাকে সামনে রেখে নির্বাচন করতে হবে। পাশাপাশি দিনমজুর তথা সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “এসআইআর-এ লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি, অ্যাডজুডিকেশন-এর পরে এখন ট্রাইবুনাল এসেছে। যেখানে যাদের নাম ডিলিট করা হয়েছে, তাঁদের আবেদন করতে বলা হয়েছে। যে মানুষটা দিন আনে দিন খায়, খেটে খাওয়া মানুষ, যাঁর কাছে এখনোও পর্যন্ত অনলাইন পরিষেবা পৌঁছায়নি, সেই মানুষটার ভাবনা কে ভাববে? সেই মানুষটার কাছে পৌঁছাবে কে এই খবরটা যে তাঁর নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে? যে প্রক্রিয়াটা চলছে তা পুরোটাই হল, জনসাধারণকে অন্ধকারে রেখে একটা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আমাদের উপর নেমে এসেছে, এর বিরূদ্ধে আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই দেব।

 

এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে এসআইআর-এর অতীতের রূপরেখা, কীভাবে ধাপে ধাপে নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে এর প্রভাব ও গুরুত্ব ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আগামী দিনের পরিকল্পনার বিষয়ে উদ্যোক্তা ও বক্তারা বক্তব্য রাখেন।

 

বরিষ্ঠ মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র যেমন মনে করিয়ে দেন, এসআইআর-এর সাংবিধানিক বৈধতা আছে কি না, তা জানতে মানবাধিকার কর্মীরা মামলা দায়ের করেন ও তার শুনানি গত জানুয়ারি মাসে শেষ হলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট সে বিষয়ে কোনোও রায় এখনো দেননি। শুনানির চলাকালীনই অন্যান্য রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করে দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে কোনো স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়নি। তিনি মতপ্রকাশ করেন যে অন্তর্ভুক্তি নয়, বর্তমানে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের বাদ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া চালাছে। তিনি উল্লেখ করেন, জুডিশিয়াল অফিসারদের দ্বারা অ্যাডজুডিকেশন-এর ঘটনাও প্রথম বার ঘটছে এবং সুপ্রিম কোর্টের দ্বারা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি-র উল্লেখও একই রকম বিস্ময়কর। সুজাত ভদ্রের বক্তব্যে উঠে আসে, নির্বাচন কমিশন যেখানে সকলের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ, সেখানে বর্তমানে এই সংস্থাই নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং সংবিধানে স্বীকৃত সার্বজননীন ভোটাধিকার এবং ধর্মভেদে, লিঙ্গভেদে বৈষম্য না করার যে আদর্শ তার থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। এসআইআর-এ পশ্চিমবঙ্গে যে ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে তার মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ ও মহিলাদের সংখ্যা সর্বাধিক। তিনি উল্লেখ করেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বর্তমানে ভয়ঙ্কর ভয় উদ্রেককারী পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিজেপির সর্বভারতীয় নেতা ভোটপ্রচারে এ রাজ্যে এসে বলছেন, রাজ্যে অনুপ্রবেশকারী ভর্তি। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বলছেন, এই বছর ভোট দিতে না পারলেও তাঁদের ভোটাধিকার চিরকালের জন্য চলে যাবে এমনটা নয়! এক চূড়ান্ত বিভ্রান্তিমূলক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।

 

পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু অধিকার আন্দোলনের প্রবীণ কর্মী সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষন করেই জানান, সার্বজনীন ভোটাধিকার এই এসআইআর প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত। এই প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক তো নয়ই, বরং বহিষ্কারমূলক। তিনি এই বিষয়টির উপর জোর দেন যে, সব ক’টি রাজনৈতিক দলই বলছে – কোনোও বৈধ নাগরিকের নাম যেন ভোটার তালিকা থেকে বাদ না যায়। তিনি জানান ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষকে বৈধ নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য কোনোও সংশোধনী আইন পাশ হলেই উদ্বাস্তু মানুষদের জন্য ভূমিপুত্রদের সমস্যায় পড়তে হত না এবং কারোরই নাগরিকত্বে প্রশ্নচিহ্ন পড়ত না। তিনি আরোও জানান যে অসংগত নাগরিকত্ব আইনের জন্য এক তৃতীয়াংশ উদ্বাস্তুর নাম বাদ গেছে। তিনি জানান এনআরসি করতে হলে রাষ্ট্রকে আগে স্থায়ী নাগরিকত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে।

 

সঙ্গীতশিল্পী মৌসুমি ভৌমিক বলেন এই প্রক্রিয়ায় বহু মানুষ আইনের চোখে বেনাগরিক, বেআইনি হয়ে যাচ্ছেন আর তা আইনিভাবে করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইস (ICE)-এর সঙ্গে এসআইআর সাদৃশ্যের কথা বলেন তিনি, যেখানে অমানবিকভাবে মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যা ঘটছে ভারতের প্রেক্ষিতে তা দেখার ও একটি ‘গ্লোবাল প্যাটার্ন’ বোঝার কথা বলেন তিনি। অধ্যাপক সমতা বিশ্বাস এসআইআর-এর ফলে পরিযায়ী শ্রমিক, প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌন পরিচিতির মানুষেরা অর্থনৈতিক-সামাজিক কারণে প্রয়োজনীয় নথির অভাবে, আইনি জটিলতায় কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন, বেনাগরিক হওয়ার দিকে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সেই বিষয়টি তুলে ধরেন।

 

এদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১০ এপ্রিল তাঁরা একটি এসআইআর বিরোধী মিছিলের ডাক দিয়েছেন এবং তাঁদের এসআইআর-এর বিরোধীতায় দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন চলবে, এসআইআর বাতিলের দাবিতে প্রয়োজনে তাঁরা অনশনের পথে হাঁটবেন।

 

 

Share this
Leave a Comment