‘আদমি হ্যায় না’ ও আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা


  • December 19, 2025
  • (0 Comments)
  • 252 Views

নীতিশ কুমারের মতো স্বনিযুক্ত অভিভাবক হয়ে যান অধিকাংশ পুরুষই পরিচিত, অপরিচিত প্রায় সব মহিলাদের। কেনই বা হবেন না? ‘আদমি হ্যায় না!’

 

সুদর্শনা চক্রবর্তী

Groundxero | December 19

 

“উও ভি তো আদমি হ্যায় না! পিছে নেহি পড় যানা চাহিয়ে। ছু দিয়া নাকাব। কহি অউর ছুতে তো তব কেয়ে হো যাতা?”

 

“তো আপকো কেয়া লগ রহা হ্যায়, কহি অউর ভি ছু দেতে (হাসি) আপ অ্যায়সি বাত কর রহে হ্যায় (হাসি) কহি অউর ছু লেতে?”

 

“নকাব পেই ইতনা হ্যায়। কহি অউরচেহারা-ওহেরা ছুয়া জাতাকহি অউর উংলি পড় জাতি তো কেয়া করতে আপ লোগ? নকাব কো ছুনা পড়া। কিঁউকি প্রমানপত্র ওহি আদমি লে রহা হ্যায় কে নহি লে রহা হ্যায়, ইয়ে তো পতা হোনা চাহিয়ে না?”

 

হ্যাঁ, অবশ্যই। আদমি – পুরুষ বলে কথা! ছুঁয়ে দেওয়ার, স্পর্শ করার অধিকার নিয়েই তো জন্মায় – হক তো বনতা হ্যায়। নারী শরীর, তা সে ঢাকা-চাপা দেওয়া হোক বা না হোক, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তা পুরুষের ভোগ্যপণ্য হয়ে থাকার জন্য যেন প্রস্তুত হয়ে থাকে। এর কোনোও অন্যথা কেনই বা হবে? কেনই বা তা এই সমাজে হতে পারে বলে আশাও বা করবেন কোনোও নারী! চার হোক বা চল্লিশ বা আশি – নারীশরীর স্রেফ ও স্রেফ যৌনতার বিষয় হতে পারে এবং তা যদি পুরুষের বলপূর্বক, তাদেরই ফ্যান্টাসি-সর্বস্ব হয়, তবেই তা স্বীকৃত হতে পারে। কারণ – ‘মেন উইল বে মেন’। ঠিক যেমন, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার হিজাব পরিহিত, নাকাবে মুখ ঢাকা আয়ুষ ডাক্তার নুসরত পরভিন-এর নাকাব খোলার চেষ্টা প্রসঙ্গে ‘দুষ্টুমি’ ভরা হাসি মুখে লেপ্টে রেখে সংবাদ মাধ্যমের বুম, ক্যামেরার সামনে এ কথা বলতে পারেন উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী সঞ্জয় নিশাদ। এবং সম্প্রচার হবে জেনেও তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা না করে, যেন খুবই তামাশার কোনোও কথা বলছেন, এহেন আচরণ করেছেন হাসি আটকাতে না পারা ভারত সমাচার সংবাদ চ্যানেল-এর সাংবাদিকও, অবশ্যই তিনি পুরুষ। কী করা যাবে সবাই-ই তো ‘আদমি হ্যায় না!’

 

বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ সদলবলে নীতিশের আচরণের সমর্থনে পাশে দাঁড়িয়েছেন, কেউ সঞ্জয় নিশাদের মতো নির্লজ্জভাবে ‘পুরুষ মানুষের আচার-ব্যবহার একটু অমন হতেই পারে বাপু’ গোছের কথা বলেছেন, তো কেউ গিরিরাজ সিং-এর মতো সংবাদ মাধ্যমের সামনে বুক ফুলিয়ে প্রবল তেজে বলছেন, “দেখিয়ে নীতিশ কুমারজি নে কোই গলত কাম নেহি কিয়া হ্যায়। আগর কোয়ি নিয়ুক্তিপত্র লেনে কে লিয়ে যা রহা হ্যায় ইয়া যা রহি হ্যায়, তো কেয়া উসকা চেহেরা নেহি দিখায়েগি? ইয়ে কোয়ি ইসলামিক দেশ হ্যায়? নীতিশকুমার জি নে এক গার্জিয়ান কে হৈসিয়াত সে…। আপ পাসপোর্ট লেনে যাতি হো তো দিখাতি হো কে নেহি? আপ এয়ারপোর্ট পে যাতে হ্যায় তো দিখাতে হ্যায় কে নেহি? পাকিস্তান অউর ইংলিশস্তান কি বাত করতে হ্যায়! ইয়ে ভারত হ্যায়, ভারত কা কানুন কা রাজ চলেগা, নীতিশ কুমার নে সহি কিয়া। (লড়কি) জাহান্নুম মে যায়ে।” ঠিক। মেয়েদের তো এমন নরমে-গরমেই রাখতে হয়। ভালবেসে, শাসনে। তাহলেই তো সে মাথা নীচু করে পুরুষের সব আদেশ শিরোধার্য করে নেবে। নীতিশ কুমারের মতো স্বনিযুক্ত অভিভাবক হয়ে যান অধিকাংশ পুরুষই পরিচিত, অপরিচিত প্রায় সব মহিলাদের। কেনই বা হবেন না? ‘আদমি হ্যায় না!’

 

কবীর সিং, অ্যানিমাল-এর রণভিজয় সিং বা আবরার হক, ধুরন্ধর-এর হামজা আলি বা রহমান ডাকাইট – পুরুষ মানে যদি অমন প্রবল পৌরুষ, তা সে শরীরে হোক বা মেজাজে না হয় – তাহলে আর ভারতীয় পুরুষ কি হলেন? নিজের ‘পসন্দিদা অউরত’ বা পছন্দের নারীকে তাঁরা ভীষণ ভালবাসা আর প্রচন্ড শাসনে তাঁদের ইচ্ছে মতো ভালো রাখবেন আবার সেই মহিলাদের সামনে খুবই নরম-সরম আচরণ করবেন, যদি তাঁদের ইচ্ছে হয়। কিন্তু দিন শেষে মাথায় রাখতে হবে সবটাই সেই পুরুষের ইচ্ছে মতো। আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতির ‘পপুলার কালচার’ এভাবেই মূলত মূলস্রোতের সিনেমা আর সামাজিক মাধ্যমের নিরন্তর রিলস আর মিম-এর স্রোতের মাঝে নারীবিদ্বেষ, নারীর প্রতি হিংসা ও বৈষম্য এবং নারীকে নিজের অধিকারের তাঁবে থাকা পণ্যের মতো দেখতে শিখিয়ে যাচ্ছে। সনাতন সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে ওঠা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পুরুষেরা নারীর ইচ্ছা ও স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে বলার পরাকাষ্ঠা হয়ে উঠছে। এই বিবমিষা উদ্রেককারী পৌরুষে প্রায় দীক্ষিত করে তুলছেন মহিলাদেরও। তাই কোটি টাকার ব্যবসা দেওয়া এই ‘টক্সিক’ পৌরুষ উদযাপনের সিনেমার দর্শক ও তাঁর প্রশংসাকারীদের মধ্যে সিংহভাগ মহিলারাও থাকেন। পুরুষেরা ছোট থেকেই তাঁদের যাবতীয় পৌরুষের জন্য উদযাপিত হন, হোক না তা কিছুটা বা পুরোটাই নারীবিরোধী। ভুলে গেলে চলবে না – ‘আদমি হ্যায় না!’

 

এই পুরুষদের উদযাপন করতে করতে আমরা ভুলে যাই, আমাদের চারপাশে থাকা ‘লা পাতা লেডিস’ সিনেমার দীপক কুমার বা ‘হোমবাউন্ড’ সিনেমার মোহাম্মদ শোয়েব বা চন্দন কুমারের কথা। যাঁরাও রক্তমাংসের পুরুষ, তাঁদের সাদা-কালো-ধূসর অস্তিত্ব নিয়েই, কিন্তু কোথাও গিয়ে যাঁরা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে শেখেন জীবনে, সমাজে নারীদের প্রতি আচরণ, সঠিক আচরণ ঠিক কেমনটা হওয়া দরকার। ভুল করেন, কিন্তু সেই ভুল হয়তো মা, স্ত্রী, বন্ধু, দিদি, অপরিচিতা কোনো নারীর মাধ্যমেই ঠিক করে নিতেও শেখেন। ‘মর্দ কো দর্দ নেহি হোতা’, ‘বয়েজ ডোন্ট ক্রাই’-এর ছক ভেঙে নিজেদের পুরুষ ইগো আর যৌনতা নিয়ন্ত্রণ করে ‘পুরুষ’ হয়ে উঠতে পারার পাঠ নেন। ভুল প্রমাণ করতে পারেন – ‘আদমি হ্যায় না’ প্রহসনকে।

 

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওগুলি এই মুহূর্তে ঘুরছে, তারমধ্যে রয়েছে এর বিরূদ্ধে দাঁড়ানো এক তরুণের ভিডিও। সেখানে দেখা যাচ্ছে এক মহিলা সাংবাদিক তাঁকে বলছেন – ‘নীতিশ কুমার কা মুড বঢ়িয়া থা, মজাক মে হিজাব খিচ দিয়া তো কেয়া হো গয়া?” উত্তরে তরুণ বলছেন – “আপ মুঝে বঢ়িয়া লাগ রহি হ্যায়, মেরা মুড করেগা হাম চুম্মা লে লেঙ্গে আপ কো। আপ কহেঙ্গে কে মুড থা। মুড কা মতলব কেয়া সমঝতি হ্যায় আপ? আপ লড়কি হ্যায় ম্যাডাম!…আপ উস ভিডিও মে সির্ফ নীতিশ কুমার কো হিজাব উতার তে হুয়ে দেখি। লেকিন হাম উস ভিডিও মে  খড়ে হুয়ে মঙ্গল পান্ডে কো হিজাব উতার তে হুয়ে নীতিশ কুমার কো দেখনে কে বাদ হসতে হুয়ে দেখে হ্যায়। আব হাম কো কৌন বাতায়েগা বিহার মে আর এস এস, ভারতীয় জনতা পার্টি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ইয়া সো কল্ড মঙ্গল পান্ডে য্যায়সে নেতাওকে চাটুকার লোগ আব কিসি বহেন-বেটিকে স্কুল যাতে সময় গলি মে রাস্তা রোককে উসকা হিজাব নেহি খিচ দেগা? এক কুমারী লড়কি কা দোপাট্টা অউর ভারতীয় মহিলা কা শাড়ি পল্লু উসকা ইজ্জত হোতা হ্যায়, উসি তারহা মুসলিম ধর্ম মে হিজাব মহিলা কা ইজ্জত হোতা হ্যায়। হিন্দু ধরম মে যব একবার পল্লু খিঁচা গয়া থা না তো মহাভারত হো গয়া থা। ইহা নীতিশ কুমার ভরে মহফিল মে হিজাব খিঁচ দিয়ে।”একটি ইন্সটাগ্রাম ভিডিও যেখানে তরুণ এই কথা বলছেন, সেখানে প্রাথমিকভাবে তাঁর বক্তব্যে নারীর প্রতি সম্মান ও এই নীতিশ কুমারের কদর্য ব্যবহারের সর্বতো বিরোধিতা চোখে পড়ে। কিন্তু বক্তব্যের শেষ দিকে গিয়ে স্পষ্ট হয় আজন্মলালিত, সামাজিক বোধ। যেখানে ওড়না, শাড়ির আঁচল, হিজাব – ধর্ম নির্দিষ্টভাবে এগুলিকে নারীর সম্মানের সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে। প্রতিটি ধর্মেই নারী শরীরকে নিয়ে যে রক্ষণশীলতা, তাঁকে রক্ষা করার গুরুভার যেভাবে পুরুষের সাহস ও পৌরুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেভাবে তাঁর শরীরের সঙ্গে, পোশাকের সঙ্গে তাঁর সম্মানকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই অসম্মানজনক আচরণের বিরোধিতা করতে গিয়েও একজন পুরুষকে সেই তথাকথিত ধর্মীয় বোধের আশ্রয়ই কোথাও না কোথাও নিতে হচ্ছে। এ হয়তো তাঁর দোষ নয়। সামগ্রিকভাবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা। যে আমাদের বেরোতে দেয় না এই ভাবনা থেকে যে – ‘আদমি হ্যায় না!’

 

তবে আশ্চর্যজনকভাবে এই যে সম্মান ও নারীকে দেখার চোখের বিষয়টি তা নির্ভর করবেই উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের নারী, দলিত নারী, নারীর যৌন পরিচয়, নারীর জাত পরিচয়, নারীর ধর্ম পরিচয়, নারীর প্রতিবনন্ধকতা বা অ-প্রতিবন্ধকতা, নারীর আর্থ-সামাজিক শ্রেণীগত অবস্থানের পরিচয়, নারীর পেশাগত পরিচয় এই সবকিছুর উপরেই। নিশ্চিতভাবেই তরুণী যদি উচ্চবর্ণের বা নিদেন পক্ষে হিন্দু হতেন ও ঘোমটায় ঢাকা থাকত মুখ নীতিশ এই ধৃষ্টতা করতেন না। অন্যদিকে নারী নির্যাতন বা নারীর প্রতি সহিংসতার বিরূদ্ধে যে দেশব্যাপী আন্দোলন বা ঘটনা-নির্দিষ্ট প্রতিবাদ ঘটে তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে সেখানেও নারীর বিবিধ পরিচয়ের উপর নির্ভর করে সেই আন্দোলনের ব্যপ্তি, গভীরতা ও রাজনীতি। সেইজন্য আমরা নির্ভয়ার জন্য পথে নেমে দেশের আইনে বদল আনতে পারি, অভয়ার জন্য দিন-রাত এক করতে পারি, কিন্তু এই দেশের এই ভারতেরই সর্বত্র দলিত বলে, মুসলমান বলে, আদিবাসী বলে সমাজ ও রাষ্ট্রের যে ভয়াবহ নির্যাতন প্রতিদিনের জীবনে সয়ে যেতে হয় অগুনতি নারীদের তার হিসাব রাখার প্রয়োজন বোধ করি না। তাই দায় আমাদের থাকে শুনে যাওয়ার ও শুনেই যাওয়ার ‘আদমি হ্যায় না!’

 

________________

Feature Image: Members of the All India Progressive Women’s Association (AIPWA) protest in Patna over the incident in which Bihar Chief Minister Nitish Kumar allegedly pulled AYUSH doctor Nusrat Parveen’s hijab during a public function.

 

Share this
Leave a Comment